প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসরাইলি কারাগারে আটক থাকার সময় যৌন নির্যাতন ও জোরপূর্বক নগ্ন তল্লাশির শিকার হওয়ার অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিক আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন জার্মান নাগরিক ও মানবাধিকারকর্মী আনা লিডকে (২৫)। গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে যাওয়া একটি আন্তর্জাতিক ত্রাণবহরের সদস্য হিসেবে তিনি আটক হয়েছিলেন। তার অভিযোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শরৎকালে ইউরোপ থেকে গাজামুখী মানবিক সহায়তা বহনকারী ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-তে অংশ নেন আনা লিডকে। আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ইসরাইলি বাহিনী বহরের একটি নৌযান আটক করলে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তিনি কয়েক দিন ইসরাইলি কারাগারে আটক ছিলেন।
আনার দাবি, আটক অবস্থায় তাকে একাধিকবার জোরপূর্বক পোশাক খুলে তল্লাশি করা হয় এবং কারাগারে তিনি যৌন সহিংসতার শিকার হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশকারী আন্তর্জাতিক অধিকারকর্মীদের ভয় দেখানো এবং তাদের নীরব করে দেওয়া।
তিনি দ্য গার্ডিয়ান-কে বলেন, আটককারীরা এমন এক মানসিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলতে সাহস না পান। তবে তিনি দাবি করেন, ভয় না পেয়ে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এ ঘটনায় ইসরাইলের অ্যাটর্নি জেনারেল, কারা কর্তৃপক্ষের আইনি উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কারাগারে তার সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে এবং যৌন সহিংসতার মাধ্যমে তার মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।
আনার আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ বলেন, এই অভিযোগ শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনার বিচার চাওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করছে। তার দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দিদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে এবং এই মামলাটি সেসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আটক থাকার সময় আনা লিডকেকে গিভন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাকে একটি আংশিক আচ্ছাদিত স্থানে পোশাক খুলতে বলা হয়। তিনি এতে আপত্তি জানালে জোরপূর্বক তার পোশাক খুলে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনাস্থলের আশপাশে নিরাপত্তা ক্যামেরা বা বডি ক্যামেরা থাকায় ঘটনার ভিডিও ধারণ হয়ে থাকতে পারে।
এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বন্দিদের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও নিজ নিজ নাগরিকদের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জর্ডানে ফেরত পাঠানোর পর নিজ দেশে ফিরে আনা লিডকে একটি রাজনৈতিক বন্দিবিষয়ক সম্মেলনে নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর একই বহরের আরও কয়েকজন অধিকারকর্মীও নিজেদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আনেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এবং ইসরাইল প্রিজন সার্ভিস (আইপিএস) এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারা কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্রের দাবি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং তাদের কর্মীদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। তারা বলেছে, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আইন ও নির্ধারিত বিধিমালা অনুসারেই আচরণ করা হয়েছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কারণ সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে যৌন সহিংসতার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আটক ব্যক্তি, মানবাধিকারকর্মী এবং ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আগেই ছিল। আনা লিডকের অভিযোগ সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এখন দৃষ্টি থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অভিযোগের বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকে।