প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের পণ্য রপ্তানিতে নতুন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার বাস্তবতায় নতুন এই উচ্চ লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে ব্যবসায়ী মহল ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আগে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে ইপিবি। বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদার ধারা, নতুন বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা এবং দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এই প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন অর্থবছরের রপ্তানি লক্ষ্য ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। যদিও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রকৃত রপ্তানি প্রায় ১ শতাংশ কম ছিল। সেই অবস্থান থেকে এক বছরে প্রায় ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ৫৮ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য নির্ধারণ করাকে অনেকেই উচ্চাভিলাষী বলছেন। তবে সরকারের ধারণা, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।
প্রতিবারের মতো এবারও দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে সরকার। ইপিবির খসড়া প্রস্তাবে তৈরি পোশাক খাত থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই এই খাত থেকে আসে। ফলে পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধিই সামগ্রিক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আগে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি, মৎস্য, চা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং বিভিন্ন রপ্তানিকারক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারের চাহিদা, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই খাতভিত্তিক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের দুই প্রধান সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএও পৃথকভাবে তাদের মতামত দিয়েছে। বিজিএমইএ গত অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের ওপর ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে লক্ষ্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে বিকেএমইএ আরও সতর্ক অবস্থান নিয়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। উভয় সংগঠনই বৈশ্বিক বাজারের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, যখন সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরেই নির্ধারিত রপ্তানি লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি, তখন এক বছরে ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, দেশের প্রধান দুটি রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানির গতি কমেছে। ফলে বিকল্প বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হলেও সামগ্রিকভাবে এত বড় লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, শুধু তৈরি পোশাক নয়, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, প্রকৌশল পণ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব খাতে উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে মোট রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক অবদান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা চাহিদার পরিবর্তন, জ্বালানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। ফলে উচ্চাভিলাষী রপ্তানি লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, উন্নত মান, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নতুন বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয়ের মূল ভিত্তি হলেও বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতেও বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বন্দর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে রপ্তানি খাত আরও শক্তিশালী হবে।
সরকারের প্রত্যাশা, নতুন অর্থবছরে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে এবং নতুন বাণিজ্য সুযোগ কাজে লাগিয়ে রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। তবে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়ন, দ্রুত প্রশাসনিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।