বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে চীন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৫ বার
বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে চীন

প্রকাশ: ১৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্যে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন এক আন্তর্জাতিক জনমত জরিপ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক পরিসরে এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক জনমত পর্যবেক্ষণ করা ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমন ফলাফল উঠে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতা বিশ্ববাসীর দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপে বিশ্বের ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ২৫টি দেশের জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি বেশি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে মাত্র ছয়টি দেশে যুক্তরাষ্ট্র এখনও জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। বাকি দেশগুলোতে দুই দেশের প্রতি জনমতের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে কম বা কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ইউরোপ, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চীনের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে স্পেন, ইতালি, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলোতে জনমতের বড় অংশ চীনের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। একইভাবে মেক্সিকো, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, নাইজেরিয়া, তুরস্ক এবং ইতালিতে চীনের জনপ্রিয়তা অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত কয়েকটি দেশে এখনও ওয়াশিংটনের প্রতি সমর্থন শক্ত অবস্থানে রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান এবং ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তা চীনের তুলনায় বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক এসব দেশের জনমতকে প্রভাবিত করেছে।

জরিপে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে জনমতের সম্পর্ক। মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও অধিকাংশ উচ্চ আয়ের দেশে চীনের ভাবমূর্তি এখনও মিশ্র বা নেতিবাচক। তবে সিঙ্গাপুর এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে। উচ্চ মাথাপিছু আয় থাকা সত্ত্বেও দেশটির মানুষের বড় অংশ চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে চীনের প্রতি সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। অন্যদিকে জাপানে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ চীনের প্রতি ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন।

জরিপে শুধু দুই দেশের জনপ্রিয়তা নয়, তাদের শীর্ষ নেতাদের প্রতি বৈশ্বিক আস্থার বিষয়টিও মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—উভয়ের প্রতিই বিশ্ববাসীর আস্থা ৫০ শতাংশের নিচে। তবে তুলনামূলকভাবে শি জিনপিং কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন। গবেষকরা বলছেন, শিকে নিয়ে মানুষের মূল্যায়ন তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও ট্রাম্পকে ঘিরে মতামত অনেক বেশি বিভক্ত। কোথাও তার প্রতি প্রবল সমর্থন, আবার কোথাও তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রতি সর্বোচ্চ আস্থা প্রকাশ করেছেন ফিলিপাইনের নাগরিকরা। বিপরীতে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম অঞ্চলে তার প্রতি আস্থা সবচেয়ে কম। গবেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য নীতি, অভিবাসন, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্য ট্রাম্পকে ঘিরে বৈশ্বিক জনমতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জনপ্রিয়তার এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতি। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। বিপরীতে চীনের ক্ষেত্রে এই ধারণা প্রকাশ করেছেন প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ। ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশ চীনের কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে কম হস্তক্ষেপমূলক হিসেবে দেখছে।

জরিপ পরিচালনার সময় বিশ্ব রাজনীতিতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আলোচনায় ছিল। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা এবং ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। অনেক অংশগ্রহণকারী এসব ঘটনাকে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করেছেন।

অন্যদিকে, চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী হওয়া সত্ত্বেও অনেক দেশ বেইজিংয়ের নীতিকে তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য এবং ধারাবাহিক বলে মনে করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, এই জরিপ শুধু দুই পরাশক্তির জনপ্রিয়তার তুলনামূলক চিত্র নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতারও প্রতিফলন। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক কৌশল, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের ধরন—সবকিছু মিলিয়েই বিশ্ববাসীর দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এই জনমতের লড়াই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত