ইউক্রেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কোরেৎস্কি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৮ বার
ইউক্রেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কোরেৎস্কি

প্রকাশ:  ১৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী হলো ইউক্রেনের রাজনীতি। দেশটির পার্লামেন্টে বিপুল ভোটে অনুমোদন পেলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কোরেৎস্কি। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ঘোষিত মন্ত্রিসভার এই ব্যাপক রদবদল ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন নেতৃত্বে এক নতুন ধারার সূচনা করল। ৪৮ বছর বয়সী এই নতুন প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস প্রতিষ্ঠান নাফতোগাজের সফল সিইও হিসেবে পরিচিত। তিনি বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সিভিরিদেঙ্কোর স্থলাভিষিক্ত হলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর গণ্ডি পেরিয়ে একজন দক্ষ পেশাদার ও প্রযুক্তিবিদকে রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে বেছে নেওয়ার ঘটনা ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রইল।

সের্গেই কোরেৎস্কির ক্যারিয়ার পথ সাধারণ রাজনৈতিক নেতাদের মতো নয়। একজন প্রকৌশলী ও অর্থনীতিবিদ হিসেবে দুই দশকেরও বেশি সময় তিনি জ্বালানি খাতে কাজ করেছেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এবং সরকারি কোনো পদে আগে কখনো কাজ করেননি। রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হওয়ায় সংকটময় এই সময়ে তাকে একজন যোগ্য ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ বা সংকট নিরসনকারী হিসেবে দেখছে বিশ্লেষকরা। ইউক্রেনের পেন্টা থিংক ট্যাংকের পরিচালক ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর মতে, দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থাকা একজন দক্ষ ব্যবস্থাপকই যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি দেশকে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে পারেন। লুতস্ক শহরে জন্ম নেওয়া কোরেৎস্কি অতীতে ইউক্রনের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইউক্রনাফতা এবং ডব্লিউজিওজির মতো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়ে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন।

নতুন প্রধানমন্ত্রীর সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো আসন্ন শীতের জন্য পুরো ইউক্রেনকে প্রস্তুত করা। গত শীতে রাশিয়ার অব্যাহত মিসাইল হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো যে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি পরিকাঠামোকে শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা তার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী শীতকাল ইউক্রেনের জন্য যুদ্ধকালীন সবচেয়ে কঠিন সময় হতে পারে। তাই এই প্রস্তুতি নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করাই হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ও প্রধান কাজ।

কোরেৎস্কির নিয়োগ নিয়ে সংসদীয় বিতর্কেও উঠে এসেছে তার প্রশাসনিক দক্ষতা। ২৮৯ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিয়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা দেশটির রাজনৈতিক ঐক্য ও স্থায়িত্বের এক বড় প্রতিফলন। তিনি কেবল যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনকেই শক্তিশালী করতে চাইছেন না, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও জীবনমান রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরো গতিশীল করার বিষয়ে তিনি নিজের রূপকল্প তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর সহায়তাকে স্বচ্ছভাবে দেশের কল্যাণে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্ব বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইউক্রেনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন রাজনীতিবিমুখ ব্যক্তির ক্ষমতায় আসা কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং জাতীয় বিপর্যয়ের মুখে টিকে থাকার এক কৌশলগত সিদ্ধান্ত। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের অর্থনীতি এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষেরই বেশি প্রয়োজন। কোরেৎস্কির অভিজ্ঞতা এবং জ্বালানি খাতের ওপর তার দীর্ঘদিনের দখল এই সংকটময় সময়ে দেশটিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। যুদ্ধ জয়ের লড়াই কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় অভ্যন্তরীণ এই সক্ষমতা অর্জনই এখন ইউক্রেনের জন্য প্রধান শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, সের্গেই কোরেৎস্কির সামনে অপেক্ষা করছে এক অনিশ্চিত ও চ্যালেঞ্জিং সময়। তবে তার অতীতের কর্মজীবন এবং দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ইউক্রেনবাসীর মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, তিনি কেবল জ্বালানি খাতেই নয়, বরং যুদ্ধকালীন কঠিনতম দিনগুলোতে রাষ্ট্র পরিচালনায় একজন দক্ষ নাবিকের মতো ইউক্রেনকে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দেবেন। একটি ভাঙা পরিকাঠামো থেকে দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রা শুরু হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্তই হতে পারে ইতিহাসের নতুন মোড়। ইউক্রেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী এখন সেই ইতিহাসেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে কাজ শুরু করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত