ইরানের ক্যানসার হাসপাতালে ভয়াবহ মার্কিন হামলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ২৩ বার
ইরানের ক্যানসার হাসপাতালে ভয়াবহ মার্কিন হামলা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আবারও বারুদ আর কান্নার রোল নিয়ে এসেছে। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি শিশুদের ক্যানসার হাসপাতালে মার্কিন বিমান বাহিনীর সাম্প্রতিক ভয়াবহ হামলা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগের ঝড় তুলেছে। এই অমানবিক হামলার ফলে হাসপাতালটির কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং মৃত্যুশয্যায় থাকা ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের জীবন নিয়ে এক অনিশ্চিত ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক সভ্যতার কোনো নীতি বা যুদ্ধকৌশলের গাইডলাইনেই নিরপরাধ ও অসুস্থ শিশুদের ওপর হামলার কোনো স্থান নেই, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই মৌলিক মানবিক অধিকারের লঙ্ঘনই যেন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিমান হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। এই বর্বরোচিত হামলায় হাসপাতালের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং হাসপাতালের ভেতরে অবস্থানরত ২১১ জন ক্যানসার আক্রান্ত শিশুর জীবনে নেমে আসে চরম আতঙ্ক। যেসব শিশু এই মুহূর্তে কেমোথেরাপির মতো জীবনদায়ী চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তাদের এই আকস্মিক স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি ছিল এক চরম মানবিক বিপর্যয়। হাসপাতালের মেঝেতে কান্নার রোল, ইনফিউশন স্ট্যান্ড নিয়ে দৌড়ঝাঁপ আর শিশুদের আর্তনাদ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটি এক বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করেছিল।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি সাহসী বার্তা দিয়েছেন। তিনি এই হামলাকে ইসরায়েলের দ্বারা পরিচালিত অতীতে চালানো বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার সাথে তুলনা করেছেন। তার ভাষায়, এটি কেবল একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা নয়, বরং এটি মানবতার ওপর সরাসরি আঘাত। ইসমাইল বাঘাই আরও উল্লেখ করেন যে, এমন একটি সংবেদনশীল স্থানে যেখানে শিশুরা তাদের জীবনের লড়াই লড়ছে, সেখানে ভারী বিমান হামলা চালানো অমানবিকতার চূড়ান্ত সীমা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত এই হামলার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, যা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।

শিশুদের হাসপাতালের ওপর হামলার মতো সংবেদনশীল ঘটনায় বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মনে ঘৃণার সঞ্চার হয়েছে। প্রতিটি শিশু, যারা মারণব্যাধি ক্যানসারের সাথে লড়ছে, তাদের সুরক্ষা দেওয়া বিশ্বের যেকোনো সভ্য রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে সেই মানবিক দায়বদ্ধতা যখন রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়, তখন তার শিকার হয় সমাজের সবচেয়ে অসহায় অংশটি। ইরানের এই হাসপাতালের ২১১ জন ক্যানসার আক্রান্ত শিশু আজ কেবল হাসপাতালের শয্যাই হারায়নি, বরং তারা হারিয়েছে তাদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সুরক্ষা। এই হামলার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটুকু পড়বে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এই ভয়াবহ ঘটনাটিকে যুদ্ধের নতুন এক অমানবিক অধ্যায় হিসেবে দেখছে। যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য অনেক সময় অবকাঠামো ধ্বংস করা একটি সাধারণ সামরিক কৌশলে পরিণত হয়, তবে হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনে একটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশের পক্ষ থেকে এমন ভুল বা উদ্দেশ্যমূলক হামলা কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার পারদ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন শিশুদের ওপর এই আক্রমণ শান্তির পথকে আরও রুদ্ধ করে দিল। ইরান সরকার এই হামলার বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

হামলা পরবর্তী সময়ে উদ্ধার অভিযান এবং শিশুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ছিল এক চরম চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী, চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই শিশুদের সরানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাদের অনেকের মতে, হাসপাতালের চারপাশ জুড়ে বৃষ্টির মতো বোমাবর্ষণের সময় এমন আর্তনাদ তারা জীবনে কখনো শোনেননি। অসুস্থ শিশুদের এই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার দায়ভার কে নেবে, সেই প্রশ্ন এখন সকলের মুখে মুখে। রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে শিশুদের এই বলিদান ইতিহাস কোনোদিন ক্ষমা করবে না। সাধারণ মানুষ আজ শান্তির খোঁজে ক্লান্ত এবং তারা এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে যুদ্ধের ভয়াল থাবা থেকে অন্তত হাসপাতালের শয্যাগুলো রক্ষা পাবে।

পরিশেষে বলা যায়, ইরানে শিশুদের ক্যানসার হাসপাতালে এই বিমান হামলা যুদ্ধের নৃশংসতার এক বীভৎস প্রতীক হয়ে থাকবে। এই ঘটনার পর বিশ্বনেতাদের কি কোনো বিবেক জাগ্রত হবে? নাকি ক্ষমতার স্বার্থে এভাবেই আরও অসংখ্য হাসপাতালের দেয়াল রক্তে রঞ্জিত হতে থাকবে? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উচিত এই ঘটনাটিকে গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনা। কেবল বিবৃতি বা নিন্দার ঝড় দিয়ে এই ক্ষত মোছা সম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা যেখানে শিশুদের অধিকার থাকবে সর্বোচ্চ সুরক্ষিত। যুদ্ধের দামামা হয়তো শোনা যাবে, কিন্তু সেই দামামার শব্দ যেন কোনো শিশুর ঘুমের শান্তি বা চিকিৎসার নিরাপত্তাকে নষ্ট না করে—এটিই আজকের দিনের একমাত্র প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত