শরিকদের পরামর্শে সরকার পরিচালনার বার্তা তারেকের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৮ বার
শরিকদের পরামর্শে সরকার পরিচালনার বার্তা তারেকের

প্রকাশ:  ২১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজপথের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, অগণিত নেতাকর্মীর কারাবরণ, মামলা, গুম ও আত্মত্যাগের অবিস্মরণীয় স্মৃতিবিজড়িত দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে সরকার গঠনের দীর্ঘ পাঁচ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির সম্মানিত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একান্ত আমন্ত্রণে গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলা এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আগামী দিনে সম্মিলিতভাবে দেশ পরিচালনা, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে সুদৃঢ় রাজনৈতিক সমন্বয় সাধন, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণ এবং দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের দিনগুলোতে জনগণের কাছে দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতি ও সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত ও খোলামেলা আলোচনা হয়। আলোচনা পর্ব শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে উপস্থিত সকল শরিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সম্মানে একটি বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করেন, যা সমগ্র রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চিন্তা ও সুদৃঢ় ঐক্যের অংশ হিসেবে সরকার পরিচালনায় শরিক দলগুলোর সুচিন্তিত মতামত, গঠনমূলক সমালোচনা ও মূল্যবান পরামর্শ গ্রহণ এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এই রাজনৈতিক জোটকে আরও অধিকতর সুসংহত ও শক্তিশালী করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর পক্ষ থেকে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের জোরালো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বটে, কিন্তু সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভায় মাত্র তিনটি শরিক দলের তিনজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্দরমহলে কিছু মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সাময়িক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে এবং শরিকদের ক্ষোভ ও আস্থার সংকট দূর করে পারস্পরিক আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই বৈঠকটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ এক রাজনৈতিক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা তাদের খোলামেলা বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রমে নিজেদের অংশীদারিত্ব এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন, যা সরকারপ্রধান অত্যন্ত ধৈর্য ও মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন।

গত সোমবার রাতের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সরকারের অংশীদার এবং যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন শরিক দলের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা সশরীরে উপস্থিত থেকে আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন শরীক দলের শীর্ষ নেতারা। এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সাইফুল হক, রফিকুল ইসলাম বাবলু, শাহাদাত হোসেন সেলিম, ফরিদুজ্জামান ফরহাদসহ বিভিন্ন সমমনা রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও এই বৈঠকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের কান্ডারি, মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, দলীয় স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন। তবে সব দল অংশ নিলেও কিছু কৌশলগত ও রাজনৈতিক কারণে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জেএসডি এই বৈঠকে অংশ নেয়নি, যা রাজনৈতিক মহলে বেশ কিছুটা কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।

বৈঠকে অনুপস্থিত থাকা প্রসঙ্গে জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ প্রথম আলোকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, তারা সুচিন্তিত দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার এই বৈঠকে যাননি এবং ঠিক কী কারণে তারা এই মুহূর্তে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকলেন, সে বিষয়ে বিএনপির গুলশান কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সম্বলিত চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে জেএসডির পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, জুলাই সনদ প্রণয়ন, জাতীয় গণভোট এবং সামগ্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক প্রশ্নগুলোতে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ও সুদৃঢ় জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে এই ধরনের পৃথক ও দলীয় রাজনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করা দলের দীর্ঘদিনের নীতিগত অবস্থান এবং সাধারণ জনগণের প্রতি প্রদত্ত পবিত্র রাজনৈতিক অঙ্গীকার সম্পর্কে কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। ঠিক এই কারণেই জেএসডি এই মুহূর্তে প্রস্তাবিত বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে যদি ভবিষ্যতে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যক্ষ ও সমান অংশগ্রহণে কোনো উন্মুক্ত জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা হয়, তবে জেএসডি তাতে অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে অংশ নেবে বলে স্পষ্ট করে জানিয়েছে।

উল্লেখ্য যে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর জন্য মোট পনেরোটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল, যার মধ্যে নিজস্ব দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী পাঁচটি ভিন্ন দলের জন্য নির্ধারিত ছিল আটটি আসন। ওই নির্বাচনে শরিকদের মধ্য থেকে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক সংসদ সদস্য হিসেবে বিজয়ী লাভ করেন। পরবর্তীতে সরকার গঠনের পর জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক ও ববি হাজ্জাজকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয় এবং আন্দালিভ রহমান পার্থকে জাতীয় সংসদের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এ ছাড়া কয়েকটি শরিক দলের প্রার্থীরা নিজেদের দলীয় পরিচয় ও প্রতীক ত্যাগ করে সরাসরি বিএনপিতে যোগদান করার পর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগদানকারী রাশেদ খাঁনকে গত রোববার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হয়।

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং কৌশলগত কারণে কিছু দলের অনুপস্থিতি এই বৈঠকে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। যুগপৎ আন্দোলনের সরাসরি অংশীদার না হলেও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে এই বিশেষ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। গত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জমিয়তের একটি শক্তিশালী নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছিল এবং বিএনপি দলটিকে সর্বোচ্চ চারটি আসন ছেড়ে দিলেও দুঃখজনকভাবে তাদের সভাপতি ও মহাসচিবসহ কোনো প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারেননি। সেই চার আসনের বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। নির্বাচনের পর থেকেই দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে কওমি মাদ্রাসা ও জামায়াত ধারার বিভিন্ন আলেম ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে নানা ইস্যুতে তীব্র মতপার্থক্য ও বিতর্ক চলমান রয়েছে। বিশেষ করে জমিয়তের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক প্রকাশ্যে জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মপদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। এই বাস্তবতার আলোকেই জমিয়তের শীর্ষ নেতারা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় মহলের সঙ্গে পূর্বেই আলোচনা করে কৌশলগত কারণে প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। জমিয়তের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দাওয়াত পেলেও দলীয় সিদ্ধান্তেই বৈঠকে যাননি।

বৈঠকসংশ্লিষ্ট একাধিক অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে যে, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে মতভিন্নতা, শরিকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং হালকা হাস্যরসের আবহ তৈরি হয়েছিল। আলোচনার শুরুতেই একজন বিশিষ্ট শরিক নেতা সরকারের পক্ষ থেকে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানোর আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র অসক্ষো প্রকাশ করেন। তাঁর প্রধান অভিযোগ ছিল যে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র মুখ্য সচিবের কার্যালয় থেকে প্রেরিত হওয়ার পর পরবর্তীতে হুট করে গুলশানে অবস্থিত বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের একজন সাধারণ কর্মকর্তা টেলিফোনে যোগাযোগ করেছেন, যা রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা ও শিষ্টাচারের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান। এছাড়া সরকার গঠনের পর থেকে বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মধ্যকার মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা এবং ঐক্য দিন দিন ঝিমিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেন কোনো কোনো নেতা। বিশেষ করে গত পাঁচ মাসে জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাভিত্তিক ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক প্রশ্নগুলোতে বিএনপির একক আধিপত্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন মহল ও শরিকদের মধ্যে যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তা বৈঠকে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়।

শরিক নেতাদের মূল আপত্তির জায়গাটি ছিল মূলত বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একতরফা মনোভাব নিয়ে। কয়েকজন শীর্ষ নেতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচন, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় বা আজ্ঞাবহ প্রশাসক নিয়োগের মতো অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে শরিক দলগুলোর কোনো ধরনের পরামর্শ বা অংশগ্রহণ রাখা হয়নি। এর ফলে সাধারণ রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন একটি নেতিবাচক ধারণা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে যে বর্তমান সরকার ও প্রধান শরিক দল বিএনপি একলা চলো নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করছে, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক জোটে দূরত্ব ও আস্থার সংকট বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে এতসব কঠোর সমালোচনার মাঝেও বৈঠকের শেষ পর্যায়ে এসে পরিবেশ কিছুটা হালকা করতে এক শরিক নেতা রসিকতার সুরে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন যে, সরকারের এই জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজটি আদতে কোনো ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’ বা বিদায়ী আয়োজন কি না। এই অপ্রস্তুত ও রসাত্মক প্রশ্নের জবাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত সাবলীল ও হাস্যরসের সুরে বলেন যে, এটি কোনো বিদায়ী আয়োজন নয়, বরং এটি একটি আন্তরিক ‘ওয়েলকাম ডিনার’ বা অভ্যর্থনা নৈশভোজ, যা উপস্থিত সকলকে মুহূর্তের মধ্যে হাসিয়ে তোলে এবং বৈঠকে এক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ ফিরিয়ে আনে।

বৈঠকে উত্থাপিত বিভিন্ন সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ও দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি উপস্থিত শরিক নেতাদের উদ্দেশে বলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন সেক্টরের জট ছাড়ানো এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক জরুরি ও জনকল্যাণমূলক নানা কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকতে হওয়ায় বিগত মাসগুলোতে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিয়মিত এবং ঘন ঘন বৈঠক করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে বর্তমান সরকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামুকে চাঙ্গা করার জন্য ইতিমধ্যে বহুমুখী ও যুগান্তকারী কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তিনি এ সময় কৃষকদের সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান, সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের জন্য বিশেষ পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু করা, দেশের ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ এবং খ্যাতিমান ও উদীয়মান খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে দেশব্যাপী প্রয়োজনীয় খাল পুনঃখননের মতো সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক বহুমুখী উদ্যোগের কথা অত্যন্ত সবিস্তারে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে গভীর আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার মূলত একটি গভীর ‘ধ্বংসস্তূপ’ থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে এবং পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ভেঙে পড়া সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও স্তম্ভ পুনর্গঠনের জন্য তারা সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি যুগপৎ আন্দোলনের সকল শরিক দলের সঙ্গে আগামী দিনে আরও অধিকতর নিয়মিত ও কার্যকর মতবিনিময় এবং আন্দোলনের সুদিনগুলোতে ঘোষিত ঐতিহাসিক ৩১ দফা কর্মসূচি ও সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

বৈঠক সমাপ্ত হওয়ার পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক নিয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং প্রদান করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির সম্মানিত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সংবাদমাধ্যমকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জানান যে, বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের দীর্ঘ পাঁচ মাস পর অনুষ্ঠিত এই প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বৈঠকটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত মাইলফলক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিগত ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে চলা পৈশাচিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, দীর্ঘ কারাবরণ, অজস্র মিথ্যা মামলা, ভয়াবহ গুম ও রাজপথের তরুণদের অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া রক্তের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বৈঠকে এক অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানান তিনি। যুগপৎ আন্দোলনের সকল শরিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম ও আন্তরিকতার বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রা ও গণতন্ত্র রক্ষায় অতীতের মতো ভবিষ্যতেও ঐক্যবদ্ধভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিকদের এক সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করে জানান যে, বর্তমান প্রচলিত নির্বাচনী আইনে রাজনৈতিক দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা করার কোনো সুনির্দিষ্ট সুযোগ নেই, তাই এ বিষয়ে ভবিষ্যতে দেশের সকল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমেই কেবল চূড়ান্ত ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। পরিশেষে পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময়ের এক আনন্দঘন ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে যুগপৎ আন্দোলনের এই শীর্ষ নেতাদের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সশরীরে অংশ নেন, যা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন ও ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com