প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রধানমন্ত্রী কারও কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্ট না হলে প্রয়োজন অনুযায়ী মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পুনর্বণ্টন কিংবা নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে এ মুহূর্তে মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক তথ্য তাঁর কাছে নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, সরকার সাইবার বুলিং, ডিপফেক ও অপতথ্য মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ আইনজীবী প্যানেল গঠনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরতে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। ব্রিফিংয়ে সরকারের পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, শিল্প খাতের পুনর্গঠন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিরোধসহ নানা বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়। এ সময় তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা হলেও তাঁর কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকে সবসময় জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন। যদি তাঁর মনে হয় কোনো মন্ত্রী বা উপদেষ্টা প্রত্যাশিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তাহলে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করতে পারেন অথবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক এখতিয়ার।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছেন দেশের কার্যক্রমকে গতিশীল করার উদ্দেশ্যে। সময়ের প্রয়োজন, কর্মদক্ষতা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় যদি কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন হয়, তাহলে তিনি অবশ্যই সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে এমন কোনো পরিবর্তন নির্দিষ্ট সময় পরপর হবে কি না, নাকি প্রয়োজন অনুযায়ী হবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও মন্ত্রিসভায় ২৪ জন মন্ত্রী এবং ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রয়েছেন ১০ জন উপদেষ্টা। বিদ্যমান রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীই মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব বণ্টন এবং পুনর্বণ্টনের ক্ষমতা রাখেন।
ব্রিফিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশজুড়ে ছিল সাইবার বুলিং, ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য নিয়ে সরকারের উদ্বেগ। তথ্য উপদেষ্টা জানান, এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় একটি বিশেষ আইনজীবী প্যানেল গঠন করা হচ্ছে। সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের বড় একটি প্ল্যাটফর্ম হলেও এর অপব্যবহারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি, মনগড়া ভিডিও, ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই নিরীহ মানুষ সম্মানহানি, মানসিক চাপ এবং সামাজিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
বিশেষ করে নারীরা সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। শুধু নারী হওয়ার কারণেই অনেককে অশালীন মন্তব্য, অপমান, মিথ্যা প্রচারণা এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব ঘটনায় সরকার কোনো ধরনের ছাড় দেবে না বলেও তিনি জানান।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন আইনজীবী প্যানেল শুধু অভিযোগের ভিত্তিতেই কাজ করবে না, প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বা জনস্বার্থে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। এতে করে ভুক্তভোগীরা দ্রুত আইনি সহায়তা পাবেন এবং অপতথ্য ছড়ানো কিংবা সাইবার অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেউ যদি সাইবার বুলিং, ডিপফেক, মিথ্যা তথ্য কিংবা অনলাইন হয়রানির শিকার হন, তাহলে যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের আগে একাধিক স্তরে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া থাকে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে যে কেউ মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারেন। তাই যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাত নিয়েও আশাব্যঞ্জক তথ্য তুলে ধরেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ, সচেতনতা কার্যক্রম এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি খাতের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ৪০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনার মধ্যে ইতোমধ্যে ২৯টি কূপ খনন সম্পন্ন হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন নিশ্চিত হয়েছে এবং এর মধ্যে ১২৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে অবশিষ্ট কূপগুলো খননের মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার ৪৯১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত যথাযথভাবে অনুসন্ধান ও ব্যবহার করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার ‘নিরাপদ খাদ্য প্রবিধানমালা-২০২৬’ জারি করেছে। একই সঙ্গে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি পরীক্ষামূলকভাবে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যা বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণ সহজ করবে।
পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব পাটজাত ব্যাগের ব্যবহার সম্প্রসারণে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন।
শিল্প খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ২৫টি মিলের মধ্যে ১৬টি মিল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মসংস্থান সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা নয়, বরং জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সেবাকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা। তিনি বলেন, পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সরকার একটি দক্ষ, আধুনিক ও সেবামুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।