পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সংঘাতে শুভেন্দু-অভিষেক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সংঘাতে শুভেন্দু-অভিষেক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ। ‘২০৩১ সালে সব হিসাব বুঝে নেব’—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ঘোষণার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ‘ভাইপোপন্থী তৃণমূলের নাম-নিশান থাকবে না’ এবং সেটি নিশ্চিত করাকে তিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন।

বুধবার (২২ জুলাই) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শহীদ দিবসের মঞ্চ থেকে বড় বড় রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘২০৩১ সালে হিসাব নেবে ভাইপো। তুমি বাইরে থাকলে তবেই তো হিসাব?’ তাঁর এই মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এই বক্তব্যের সূত্রপাত হয় গত ২১ জুলাই তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী ‘শহীদ দিবস’ সমাবেশকে কেন্দ্র করে। কলকাতায় অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে দীর্ঘদিন পর বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, নানা রাজনৈতিক চাপ, মামলা এবং দল ভাঙার চেষ্টা সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেস ঘুরে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, ‘গাদ্দারি করে তৃণমূলকে দুর্বল করা যাবে না। বাংলা থেকে বিজেপিকে উৎখাত করবই। কী করবে বিজেপি? জেলে ভরবে? মিথ্যা মামলায় ফাঁসাবে? ফাঁসাক। তবু মাথা নত করব না। কারণ, আমার মেরুদণ্ড বিক্রি করার জন্য নয়।’

অভিষেক আরও বলেন, ‘আজ নতুন করে তৃণমূলের জন্ম হলো। এ নতুন তৃণমূল আগামী ৪০ বছর বাংলার রাজনীতিতে লড়াই চালিয়ে যাবে। ২০৩১ সালে সব হিসাব বুঝে নেবে।’ তাঁর এই বক্তব্যকে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হলেও বিরোধী শিবির তাৎক্ষণিকভাবে এর কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়।

চলতি বছরের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনে বিজেপি সরকার গঠন করলেও তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করে। তবে নির্বাচনের পর থেকেই দলটিতে ভাঙনের ঘটনা সামনে আসে। একাধিক বিধায়ক ও সাংসদ দল ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দেওয়ায় তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটেই দলকে পুনর্গঠনের বার্তা দিতে চাইছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে শুধু রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি আমপান-সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগও সামনে আনেন। শুভেন্দু জানান, আগামী ২৫ জুলাই ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব নিরীক্ষক (সিএজি)-এর ২৮টি প্রতিবেদন বিধানসভায় উপস্থাপন করা হবে। ওই প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি চেয়ে রাজ্যপালের কাছে আবেদন করা হবে বলেও তিনি জানান।

শুভেন্দু অধিকারীর ভাষায়, ‘কেউ রেহাই পাবে না। যত দুর্নীতি হয়েছে, সব বের করে আনা হবে।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আপনি বেঁচে থাকতে থাকতেই প্রমাণ করে দেব, আপনি প্রতিষ্ঠিত “চোর”।’ তাঁর এই মন্তব্যও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে সংঘাত এখন কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নির্বাচনী প্রচারণায় সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন বিধানসভার ভেতরেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলে জনমত নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং বিজেপি সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ আগামী কয়েক বছরে রাজ্যের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এখন থেকেই রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও বিভিন্ন মহল থেকে সংযত ভাষা ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ ও উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের পরিবর্তে নীতিনির্ভর বিতর্কই জনগণের প্রত্যাশা।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে পারে। সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ালেও ভবিষ্যতের সমীকরণ নির্ধারণ করবে শেষ পর্যন্ত জনগণের রায় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত