প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পিরোজপুরের নেছারাবাদের ঐতিহ্যবাহী আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান দেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র। বর্ষা মৌসুমে জলপথে বিস্তীর্ণ পেয়ারা বাগানের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন। তবে পর্যটকের ক্রমবর্ধমান চাপ, পরিবেশ দূষণ এবং নিরাপত্তাজনিত নানা বিষয় বিবেচনায় এবার ভ্রমণকারীদের জন্য আটটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের আশা, এসব নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে এই অনন্য প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আরও সুরক্ষিত থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দত্ত স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান একটি পরিবেশ-সংবেদনশীল এলাকা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমনের কারণে এখানকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য, নৌপথের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় কৃষিকাজের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় পর্যটকদের জন্য কিছু বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যা মেনে চলা সকলের দায়িত্ব।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাগান এলাকায় কোনো ধরনের লাউড স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম কিংবা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করে এমন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রশাসনের মতে, উচ্চ শব্দ শুধু পরিবেশ দূষণই সৃষ্টি করে না, বরং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে এবং এলাকার পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থলেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশের শান্ত আবহ বজায় রাখতে পর্যটকদের সংযত আচরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া পর্যটকদের শালীন পোশাক ও আচরণ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নারী, পুরুষ, শিশু ও বয়স্কসহ সব বয়সী মানুষ এই পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণে আসেন। ফলে সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুণ্ন রাখতে প্রত্যেক দর্শনার্থীকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
প্রশাসন আরও জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো বাগানে প্রবেশ করা যাবে না। একই সঙ্গে পেয়ারা, আমড়া, গাছের পাতা বা অন্য কোনো উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্থানীয় কৃষকদের বছরের পর বছর পরিশ্রমের ফসল রক্ষা এবং বাগানের স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যত্রতত্র নৌযান ভিড়িয়ে বাগানের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বড় আকারের ট্রলার কিংবা উচ্চ শব্দযুক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌযান বাগান এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। এর পরিবর্তে ছোট বা মাঝারি আকারের নৌযান ব্যবহারের জন্য পর্যটক ও নৌযান পরিচালকদের উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, এতে জলপথে যানজট কমবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং খালের স্বাভাবিক পরিবেশও অক্ষুণ্ন থাকবে।
পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে পর্যটকদের সঙ্গে আনা খাবারের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল বা অন্য কোনো বর্জ্য পানিতে কিংবা বাগানের আশপাশে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিটি নৌযানে অন্তত একটি করে ডাস্টবিন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে ভ্রমণ শেষে বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করা যায়। প্রশাসনের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যের কারণে এলাকার পরিবেশ ও জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতির মুখে পড়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ট্রলার বা নৌযানে পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয়া রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে নৌযানের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্ষাকালে পানির স্রোত ও নৌযানের চাপ বিবেচনায় দুর্ঘটনা এড়াতে এসব নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ঘোষিত নির্দেশনা অমান্য করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজন হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা কিংবা অন্যান্য আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। প্রশাসনের লক্ষ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন, আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান শুধু পিরোজপুরের নয়, পুরো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পর্যটনসম্পদ। এই এলাকার সৌন্দর্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পর্যটক, নৌযান চালক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রকৃতিকে ভালোবেসে এবং নিয়ম মেনে ভ্রমণ করলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই অনন্য পর্যটনকেন্দ্র সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগানে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। খালের দুই পাশে সারি সারি পেয়ারা গাছ, নৌকাভ্রমণ এবং সবুজ প্রকৃতির অনন্য সমন্বয় এই স্থানটিকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশাসনের নতুন নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে আটঘর-কুড়িয়ানা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই টেকসই পর্যটনের একটি সফল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।