দিল্লিতে সংঘর্ষ, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
দিল্লিতে সংঘর্ষ, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) গভীর রাত পর্যন্ত যন্তর মন্তর এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে বলে প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের দাবি, কিছু বিক্ষোভকারী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে পাথর ও প্লাস্টিকের বোতল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যন্তর মন্তরে বুধবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ জড়ো হন। আন্দোলনকারীদের বড় অংশ ছিলেন শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণী। তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সমর্থকেরাও যোগ দেন। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মে মাসে অনুষ্ঠিত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা সদ্যগঠিত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ঘোষণা দিয়েছে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে।

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর তরুণদের অংশগ্রহণে এটিই সবচেয়ে বড় আন্দোলন। কর্মসংস্থানের সংকট, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এই আন্দোলনে নতুন গতি এনে দিয়েছে।

সংঘর্ষের আগে বুধবার সকাল থেকেই যন্তর মন্তর এলাকায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। জাতীয় পতাকা হাতে, বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে তারা বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। একই সময়ে সংসদ ভবনের বাইরেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যার পর আন্দোলনকারীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং যন্তর মন্তর ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কগুলোতেও মানুষের ভিড় ছড়িয়ে পড়ে।

দিল্লি পুলিশের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, রাতের দিকে কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে পাথর ও প্লাস্টিকের বোতল নিক্ষেপ করেন। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং কয়েকটি স্থানে লাঠিচার্জ চালায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া এবং লাঠিচার্জের দৃশ্য দেখা গেছে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এসব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), যা শুরুতে একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি তরুণদের একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন বন্ধ হবে না। তিনি বলেন, “আজ ২৫ দিন হয়েছে। যদি ২৫ মাসও লাগে, তবু আমরা এখান থেকে সরব না।”

পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি ও আশপাশের ১৬টি মেট্রো স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে নিরাপত্তাজনিত কারণে দ্বিতীয়বারের মতো এত সংখ্যক স্টেশন বন্ধ করা হলো। এতে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়েছে।

ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে মোদি সরকার ইতোমধ্যে সিজেপি নেতাদের সঙ্গে এক দফা বৈঠক করেছে। সরকার শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে এবং সংসদে পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবও দিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, শুধু আশ্বাস নয়, তারা দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান। তাদের প্রধান দাবি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এদিকে বিরোধী দলগুলোও আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশ তাদের সাময়িকভাবে আটক করলেও পরে মুক্তি দেয়। রাহুল গান্ধী বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের প্রশ্নে কোনো আপস হবে না।

সংসদের চলমান বর্ষাকালীন অধিবেশনেও এই ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখতে চাইছে বিরোধীরা। বৃহস্পতিবার বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের ভেতরের বিতর্ক এবং রাজপথের আন্দোলন একসঙ্গে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে কর্মসংস্থান সংকট, উচ্চশিক্ষায় অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের ক্ষোভ তৈরি করেছে। সেই ক্ষোভই এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। এর ফলে আন্দোলনটি শুধু একটি পরীক্ষা বা একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি তরুণদের আস্থা, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই আন্দোলন আগামী দিনের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মনোভাব, বিরোধী দলগুলোর অবস্থান এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া আগামী মাসগুলোতে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত