প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়ার সদর উপজেলায় পূর্ব শত্রুতার জেরে সাবেক ছাত্রদল নেতা আতিকুর রহমান সাগর মন্ডল (২৬) হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গভীর রাতে নিজ বাড়ির উঠানে একদল দুর্বৃত্তের হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে শাপলা নামে এক নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং ঘটনার পেছনের বিরোধ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বুধবার (২৩ জুলাই) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে বগুড়া সদর উপজেলার চালিতাবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বগুড়া সদর থানার ওসি (তদন্ত) মাহফুজ আলম। নিহত আতিকুর রহমান সাগর মন্ডল সদর উপজেলার শাখারিয়া ইউনিয়নের পাঁচবারিয়া গ্রামের শাহাদাত মন্ডলের ছেলে এবং শাখারিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সাগর মন্ডলের বিরোধ চলছিল। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সেই বিরোধের জের ধরেই এ হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছে না পুলিশ।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় সাগর তার স্ত্রী মারজিয়া খাতুনসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি চালিতাবাড়ি গ্রামে অবস্থান করছিলেন। রাতের খাবার খাওয়ার সময় তিনি বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ বাইরে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে পরিবারের সদস্যরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একদল ব্যক্তি বাড়ির টিনের গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
স্বজনদের অভিযোগ, হামলাকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন সাগরের জেঠাতো ভাই জেলহাস। তার সঙ্গে আরও ২০ থেকে ২৫ জন ছিলেন। তারা ধারালো অস্ত্র নিয়ে সাগরের ওপর অতর্কিত হামলা চালান এবং এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। প্রাণ বাঁচাতে সাগর দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও কিছুদূর গিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
নিহতের স্ত্রী মারজিয়া খাতুন অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। তিনি বলেন, স্বামীকে বাঁচাতে চিৎকার করলে হামলাকারীরা তাকেও ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়। আহত স্বামীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও হামলাকারীদের কয়েকজন তাদের অনুসরণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে প্রতিবেশীদের সহায়তায় গলিপথ দিয়ে সাগরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
হত্যাকাণ্ডের পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতের মা সাজেদা বেগম বলেন, তার ছেলেকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, গুরুতর আহত অবস্থায় তার ছেলে পানির জন্য ছটফট করলেও হামলাকারীরা তাকে একফোঁটা পানিও পান করতে দেয়নি। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে। বগুড়া সদর থানার ওসি (তদন্ত) মাহফুজ আলম জানান, প্রাথমিকভাবে এটি পূর্ব শত্রুতাজনিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার প্রতিটি দিক গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং কারা হামলায় অংশ নিয়েছে, তাদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে।
তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে শাপলা নামে এক নারীকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। এছাড়া অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান শুরু করেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত সাগর মন্ডলের বিরুদ্ধে অতীতে মারামারি, মাদক এবং অস্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট ছয়টি মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের পূর্ব বিরোধ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং স্থানীয় বিরোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে জানিয়েছেন, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। তবে সেই বিরোধ এতটা ভয়াবহ রূপ নেবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি। প্রকাশ্যে গভীর রাতে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। অনেকেই দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ব শত্রুতাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিরসন, দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত হলে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমানো সম্ভব হবে।
বর্তমানে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বগুড়ার এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় একজন সাবেক ছাত্রনেতার মৃত্যু এবং এর পেছনে পূর্ব শত্রুতার অভিযোগ নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তবে পুলিশ বলছে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।