বায়ুদূষণে ৫১তম ঢাকা, শীর্ষে কিনশাসা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
বায়ুদূষণে ৫১তম ঢাকা, শীর্ষে কিনশাসা

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং যানবাহনের নির্গমন বৃদ্ধির কারণে বায়ুদূষণ এখন অন্যতম বড় পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ করে প্রকাশিত সূচকে দেখা যাচ্ছে, কোথাও দূষণ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে, আবার কোথাও পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও উদ্বেগের কারণ রয়ে গেছে। এমন বাস্তবতায় বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাতাস মাঝারিমানের হলেও বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় এর অবস্থান ৫১তম।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার (IQAir)-এর প্রকাশিত এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার বায়ুমান স্কোর ছিল ৫৯। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৫১ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকা স্কোরকে ‘মাঝারি’ বা ‘Moderate’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি না থাকলেও দীর্ঘসময় বাইরে অবস্থান করলে সংবেদনশীল ব্যক্তি, শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগে আক্রান্তদের কিছুটা সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের অবস্থানে রয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা। শহরটির বায়ুমান স্কোর ১৬৩, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ বা ‘Unhealthy’ শ্রেণিতে পড়ে। এই মাত্রার দূষণে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং দীর্ঘসময় বাইরে অবস্থান শ্বাসতন্ত্র ও হৃদযন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা। শহরটির বায়ুমান স্কোর ১৫৯, যা একইভাবে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স, যার স্কোর ১৩৪। এটি সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা, যার স্কোর ১৩৩। পঞ্চম স্থানে রয়েছে জেরুজালেম, যেখানে বায়ুমান স্কোর ১১৮।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী খরা, দাবানল, ধুলিঝড়, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, শিল্পকারখানার ধোঁয়া এবং যানবাহনের নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুদূষণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নির্মাণকাজের কারণে বাতাসে ভাসমান অতিক্ষুদ্র ধূলিকণার মাত্রা বাড়ছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাও দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণের সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নির্মাণকাজ, ইটভাটা, সড়কের ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া এবং শিল্পকারখানার নির্গমন মিলিয়ে বায়ুর মান দ্রুত অবনতি ঘটে। বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের কারণে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা অনেকটাই ধুয়ে যায়, ফলে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কমে আসে। বর্তমান সময়ে ঢাকার বায়ুমান মাঝারি পর্যায়ে থাকলেও পরিবেশবিদরা বলছেন, এটি আত্মতুষ্টির কোনো কারণ নয়। কারণ সামান্য আবহাওয়ার পরিবর্তন বা বৃষ্টিপাত কমে গেলে দূষণের মাত্রা আবারও দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে, বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ। দূষিত বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র কণা বা পিএম ২.৫ (PM2.5) এবং পিএম ১০ (PM10) মানবদেহের শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসার, হাঁপানি এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এসব দূষণের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

আইকিউএয়ারের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ স্কোরকে ‘ভালো’ হিসেবে ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত স্কোর মাঝারি মানের, যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি সীমিত থাকে। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৫১ থেকে ২০০ স্কোর হলে সেটিকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষেরও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোরকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয় এবং এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ৩০১ থেকে ৪০০ স্কোরকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘Hazardous’ ধরা হয়, যা পুরো জনসংখ্যার জন্যই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোও বায়ুদূষণ কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গণপরিবহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটার আধুনিকায়ন এবং নগর এলাকায় সবুজায়ন বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বায়ুর মান উন্নত করা সম্ভব।

ঢাকার বায়ুমান বর্তমানে মাঝারি পর্যায়ে থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ধরে রাখতে হলে পরিবেশ সংরক্ষণে ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় শুষ্ক মৌসুমে রাজধানী আবারও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকার শীর্ষ দিকে চলে যেতে পারে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এবং কঠোর পরিবেশগত নজরদারি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ যে ক্রমেই বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে, আইকিউএয়ারের সর্বশেষ সূচক সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও বৃহস্পতিবারের হিসাবে ঢাকার বাতাস মাঝারিমানের ছিল, তবুও এটি নগরবাসীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। সুস্থ ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতনতার বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত