প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের গুঞ্জন অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য এবং দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে যে, দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন খুব শিগগির নিজের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারেন। তাঁর শারীরিক অসুস্থতাকে এই সম্ভাব্য পদত্যাগের প্রধান এবং আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিগত দিনে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ ও অপসারণ নিয়ে নানা মহলে বহুমুখী আলোচনা ও বিতর্ক চলে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানোর পর এই গুঞ্জন এখন চূড়ান্ত বাস্তব রূপ নেওয়ার পথে রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এই সম্ভাব্য পরিবর্তন বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরবর্তী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বঙ্গভবনকেন্দ্রিক একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ইতিমধ্যে তাঁর অধস্তন কর্মকর্তা ও প্রাত্যহিক দাপ্তরিক কর্মীদের খুব দ্রুত বঙ্গভবন ছেড়ে যাওয়ার জন্য এক ধরনের মৌখিক ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। পদত্যাগের পর তিনি জনসমক্ষে না থেকে কিছুদিন নিভৃতে বিশ্রামে থাকার পরিকল্পনা করেছেন। এমনকি শারীরিক অসুস্থতার উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি খুব শীঘ্রই বিদেশেও পাড়ি জমাতে পারেন বলে ওই সূত্রে প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি। তাঁর পাঁচ বছরের এই সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিল মাসের দিকে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে অভূতপূর্ব ও আমূল পরিবর্তন এসেছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদেও। ৫ আগস্টের পর থেকেই ছাত্রনেতারা এবং বিভিন্ন আন্দোলনকারী সংগঠন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবি জোরালোভাবে তুলেছিল এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও করার মতো কঠোর কর্মসূচিও অতীতে পালিত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
রাষ্ট্রপতির এই সম্ভাব্য পদত্যাগের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল ও জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয় ও তীব্র আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অতীতে দেশের প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্য থেকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতির নাম নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গেলেও সম্প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অপ্রত্যাশিত একটি নাম আকস্মিকভাবে সামনে চলে এসেছে। সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদে বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে নিয়োজিত দেশের একজন জ্যেষ্ঠ সচিবের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রবলভাবে আলোচিত হচ্ছে। প্রশাসনিক দক্ষতা, দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং নীতিনির্ধারকদের আস্থার জায়গা থেকেই তাঁর নাম নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এর আগে বিএনপির প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আবদুল মঈন খানের নামও রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় বেশ জোরালোভাবে ছিল। তবে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে এ ধরনের কোনো বিষয় সম্পর্কে তাঁর কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক তথ্য নেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদের ৩ উপঅনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি যেকোনো সময় জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদ্দেশ্যে নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে পদত্যাগ করার পূর্ণ এখতিয়ার রাখেন। অন্যদিকে, সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে যদি রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় কিংবা গুরুতর অসুস্থতা বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে তিনি নিজ দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ অসমর্থ হন, তবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন। সেই হিসাব অনুযায়ী মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধানের সুনির্দিষ্ট বিধান বর্তমান স্পিকারকেই সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করার সুযোগ দেবে। এরপর সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের ভোট গ্রহণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেহেতু বর্তমান জাতীয় সংসদে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিরঙ্কুশ ও শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই দলের মনোনীত প্রুফ বা প্রার্থীরই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কথা। একই সঙ্গে রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর বিএনপি প্রথমবারের মতো নিজেদের সম্পূর্ণ পছন্দের কোনো ব্যক্তিকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানোর এক ঐতিহাসিক সুযোগ পাচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরবর্তী রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে মনে রাখতে হবে যে নতুন রাষ্ট্রপতিকে সামনের দিনগুলোতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য যেকোনো রাজনৈতিক চাপ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সামлаতে হবে। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ, বিরোধী দল এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার মতো দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকেই এই পদের জন্য বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিগত গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একজন পরিপক্ব ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির অভিভাবক পাওয়া এখন সময়ের দাবি। নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন এবং এই পদে আসার পর তিনি কীভাবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আস্থার সংকট দূর করে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অতীত কর্মজীবন এবং রাজনৈতিক বিতর্কও এই পদত্যাগের আলোচনাকে বহুলাংশে প্রভাবিত করেছে। ইতিপূর্বে ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সে সময় তাঁর বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের এক সময়ের প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম গ্রুপের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি জনসমক্ষে চলে আসে। দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও অত্যন্ত লাভজনক ও প্রভাবশালী দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সে সময় দেশের অর্থনৈতিক খাতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্যাংক দুটিতে যে নজিরবিহীন লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল, তার সঙ্গে বিভিন্ন মহলে তাঁর নাম জড়িয়ে নানা সমালোচনা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে এস আলমের প্রতিনিধি বলেও বিভিন্ন সময় অভিহিত করা হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংকের মতো বিতর্কিত পদ থেকেই তাঁকে সরাসরি দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য এই পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি বিশাল ও যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটিতে এই পরিবর্তন দেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক যাত্রাকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়া এবং পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে এক নতুন গতিপ্রবাহ আনবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলের প্রতিটি স্তরে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আর তা হলো বঙ্গভবনের পরবর্তী অভিভাবক হিসেবে কার নাম চূড়ান্তভাবে সিলমোহর পেতে চলেছে এবং নতুন এই সাংবিধানিক পরিবর্তন দেশের রাজনীতিতে ঠিক কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।