আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে জিয়া হত্যা মামলার আসামি মোজাফফর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে জিয়া হত্যা মামলার আসামি মোজাফফর

প্রকাশ:   ২৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, সামরিক ক্যু এবং বিচারিক অঙ্গনে এক চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত দূরপ্রসারী মোড় পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দীর্ঘকাল পলাতক আসামি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁকে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসার পর থেকেই পুরো আদালত চত্বর, সুশীল সমাজ এবং দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের আড়ালে থাকা এবং অবশেষে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর এই ট্রাইব্যুনাল উপস্থিতি দেশের বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশেষভাবে নজড় কেড়েছে। ঐতিহাসিক এই মামলার বিচারকাজ এবং এর নেপথ্য ঘটনাগুলো নিয়ে সাধারণ জনগণের মাঝেও ব্যাপক কৌতূহল ও গভীর আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বিগত কয়েক দশক ধরে অমীমাংসিত থাকা বহু জাতীয় রহস্য ও সত্য উন্মোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সচেতন মহল মনে করছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর স্বনামধন্য ও সম্মানিত চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে আজ এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চাঞ্চল্যকর মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানানো হয়েছে যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ও স্বৈরাচারী শাসনামলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। এই সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে বিশেষ প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট বা আদালতে হাজির করার আনুষ্ঠানিক পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের সেই স্পষ্ট ও কঠোর আদেশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই আজ তাঁকে বিচারিক আদালতে সশরীরে হাজির করা হয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে আজকের শুনানিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই গুরুতর মামলায় তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো এবং পরবর্তীতে ব্যাপক ও গভীর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে জোরালো আবেদন পেশ করা হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। আদালতের এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যদিবসের দিকে এখন গোটা দেশের নজর নিবদ্ধ রয়েছে এবং এই শুনানির ওপর নির্ভর করছে মামলার পরবর্তী আইনি গতিপ্রকৃতি।

এর আগে গত ২১ জুলাই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান এই আসামির বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চেয়ে আদালতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছিল প্রসিকিউশন টিম। দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে পলাতক জীবন কাটানোর পর গত ১৫ জুলাই দিবাগত রাতে রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর একটি সুনির্দিষ্ট বাসা থেকে মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তারের পরবর্তী যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করার পর গত ১৬ জুলাই তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে যথাযথ নিয়মের মধ্য দিয়ে হস্তান্তর করা হয়েছিল। দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে দেশের ভেতরে বা বাইরে বিভিন্ন মহলের সুরক্ষা ও সহযোগিতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকা এই আসামির গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালে সোপর্দ করার ঘটনাটি বাংলাদেশের অপরাধ ও বিচার ইতিহাসের অন্যতম একটি বড় ও যুগান্তকারী সফলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে জাতির এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার একটি মজবুত ও আইনি পথ সুগম হলো।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ফেনী জেলায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মামলায় অভিযুক্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য গত ২১ জুলাই সুনির্দিষ্ট দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ওই দিন তদন্তকারী সংস্থা ও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মামলার অধিকতর তদন্ত ও তথ্যানুসন্ধানের স্বার্থে আদালতের কাছে আরও দুই মাস সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়। তবে মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশ থাকার অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ থাকায় আদালত সেদিন কোনো নতুন বা দীর্ঘ তারিখ নির্ধারণ করেননি। মূলত এই দুই আসামির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সংযোগ, ষড়যন্ত্রের জাল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সঠিক মাত্রা নিরূপণের জন্যই আজ লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। তাঁদের উভয়ের এই যুগপৎ উপস্থিতি এবং ট্রাইব্যুনালের এই অত্যন্ত গতিশীল কার্যক্রম দেশের বর্তমান বিচারব্যবস্থায় এক নতুন ও ইতিবাচক মাত্রা যোগ করেছে, যা আগামী দিনে যেকোনো ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান ও ফলপ্রসূ করবে বলে সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করছেন।

মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনের এই ট্রাইব্যুনাল উপস্থিতি কেবল একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলার আসামির আইনি মোকাবেলা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সমগ্র রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসের এক সুদূরপ্রসারী ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা একজন প্রভাবশালী আসামিকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো প্রমাণ করে যে অপরাধ যত পুরোনোই হোক না কেন, উপযুক্ত তথ্য-উপাত্ত, সঠিক প্রমাণ এবং রাষ্ট্রের সদিচ্ছা থাকলে দেরিতে হলেও নিখাদ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার মতো একটি স্পর্শকাতর ও জাতীয়ভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নেপথ্য সত্য উদঘাটন এবং সাম্প্রতিক মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এই ট্রাইব্যুনাল সেশন অত্যন্ত ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করছে। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর এবং পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এই মামলার জট খুলবে এবং দেশবাসী অনেক অজানা ও চাঞ্চল্যকর সত্য জানতে পারবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস সকলের। বিচারিক প্রক্রিয়া যত দ্রুত সামনের দিকে এগোবে, ততই এই চাঞ্চল্যকর মামলার অন্ধকার দিকগুলো একে একে উন্মোচিত হবে এবং অপরাধীরা তাদের কৃতকর্মের জন্য উপযুক্ত শাস্তির মুখোমুখি হবে বলে দেশের আপামর জনসাধারণ প্রত্যাশা করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত