প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, বীর উত্তম কর্নেল আবু তাহেরের ৫০তম হত্যা দিবস উপলক্ষে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং স্মরণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। দিবসটি ঘিরে দলটির নেতারা কর্নেল তাহেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক হিসেবে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
মঙ্গলবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে শহীদ কর্নেল তাহের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আলোচনা সভায় জাসদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন বাম ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ এবং দলীয় কর্মীরা অংশ নেন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায়ও পৃথকভাবে স্মরণসভা, পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জাসদের কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকালে কর্নেল আবু তাহেরের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এছাড়া দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার কাজলা গ্রামে অবস্থিত কর্নেল তাহেরের সমাধিতেও দলীয় নেতাকর্মীরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
রাজধানীর আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সভাপতি রবিউল আলম। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদুল হাসান মানিক, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের সদস্য মোশাহিদ আহমেদ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শামীম আরাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, কর্নেল আবু তাহের শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি ন্যায়ভিত্তিক, শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নদ্রষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের পর রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে তিনি যে রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক বলে তাঁরা মন্তব্য করেন। তাঁদের মতে, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কর্নেল তাহের সময়ের অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন।
আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, ১৯৭২ সালেই কর্নেল তাহের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো অপরিবর্তিত রেখে স্বাধীনতার লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে তিনি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনর্গঠনের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছিলেন বলে বক্তারা দাবি করেন। তাঁদের মতে, সময়ের পরিক্রমায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই আশঙ্কার প্রতিফলনও দেখা গেছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে কর্নেল তাহেরের আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তাঁরা মনে করেন, স্বাধীনতার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনের জন্য গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।
বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় পুনর্জাগরণ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি। এ জন্য দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তাঁরা। জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
নেত্রকোনার পূর্বধলার কাজলা গ্রামে কর্নেল তাহেরের সমাধিতে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতেও স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নেন। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত স্মরণসভায় বক্তারা তাঁর জীবন, সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রচিন্তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, কর্নেল তাহেরের আত্মত্যাগ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম একজন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও তিনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, রাষ্ট্রচিন্তা এবং মৃত্যুকে ঘিরে বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আলোচনা, গবেষণা ও বিতর্ক রয়েছে।
জাসদের নেতারা বলেন, কর্নেল তাহেরের জীবন ও আদর্শ নিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে গবেষণা এবং ইতিহাসচর্চা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। তাঁরা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাঁর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধে আরও উদ্বুদ্ধ হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কর্নেল তাহের বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা যেমন ব্যাপকভাবে স্বীকৃত, তেমনি স্বাধীনতার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মৃত্যুকে ঘিরেও ইতিহাসে নানা মূল্যায়ন রয়েছে। ফলে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে প্রতিবছরই বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁকে স্মরণ করে থাকে।
৫০তম হত্যা দিবস উপলক্ষে জাসদের আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতারা শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়েই গুরুত্ব দেন—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। তাঁদের মতে, কর্নেল আবু তাহেরের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে তখনই, যখন স্বাধীনতার মূল আদর্শ বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ও সমাজ সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাবে।