প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক পরিস্থিতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারকে সামনে রেখে ৯৫ বিলিয়ন ডলারের একটি উচ্চপর্যায়ের বাজেট পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। বুধবার (২২ জুলাই) অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে অল্প ব্যবধানে পাস হওয়া এই বাজেট কাঠামো এখন সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সিনেটে অনুমোদন পেলে এটি ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি ২১৬–২১৪ ভোটে পাস হয়। রিপাবলিকানদের সমর্থনে অল্প ব্যবধানে অনুমোদিত হওয়া এই বাজেট পরিকল্পনাকে চলতি বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অনুমোদিত বাজেট কাঠামো অনুযায়ী, মোট ৯৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলার সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বিভাগ (পেন্টাগন) এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ অর্থের একটি বড় অংশ ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযান, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, যুদ্ধ-সংক্রান্ত সরঞ্জাম সংগ্রহ, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হোয়াইট হাউস এবং রিপাবলিকান নেতৃত্বের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ইরানকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। তাদের মতে, এই বাজেট শুধু চলমান সামরিক কার্যক্রম পরিচালনাই নয়, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিশ্চিত করবে।
বাজেট পরিকল্পনায় শুধু প্রতিরক্ষা খাতই নয়, দেশের কৃষি ও নির্বাচন ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ১২ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং শুল্কনীতির কারণে ক্ষতির মুখে পড়া কৃষকদের সহায়তা দিতেই এই অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচন-সম্পর্কিত কর্মসূচির জন্য আরও ১০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই অর্থ দেশজুড়ে নতুন ভোটদান-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কার্যকর এবং নির্বাচনী নিরাপত্তা জোরদারে ব্যবহার করা হতে পারে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বৃহত্তর ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ কংগ্রেসে প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ায় সেটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বাজেট পরিকল্পনা রিপাবলিকান পার্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়েও গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়নে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন।
বাজেট অনুমোদনের পর প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, এই প্রস্তাব রিপাবলিকানদের দুটি প্রধান লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন আরও সুরক্ষিত করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করাই এই বাজেট পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য।
তবে বাজেটটি নিয়ে কংগ্রেসে তীব্র বিতর্কও হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা রোসা ডেলাউরো এই পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এ বাজেট অনুমোদনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক ভিত্তি পাচ্ছেন।
রোসা ডেলাউরো বলেন, মার্কিন জনগণ মধ্যপ্রাচ্যে অনির্দিষ্টকাল ধরে চলা ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী যুদ্ধ চায় না। বরং তারা খাদ্য, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুযত্ন এবং জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্য কমানোর মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করে। তাঁর মতে, জাতীয় সম্পদের বড় অংশ যুদ্ধের পেছনে ব্যয় না করে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। খাদ্যপণ্য, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নির্বাচনী রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন বাজেট পরিকল্পনাটি সিনেটে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে এটি অনুমোদিত হলে প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান সদস্যরা গ্রীষ্মের শেষ দিকে বিস্তারিত ব্যয় পরিকল্পনাসহ পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবেন। পরবর্তীতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিলটি পাস করানোর চেষ্টা করা হবে, যাতে প্রচলিত ৬০ ভোটের বাধ্যবাধকতা এবং ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য বাধা এড়ানো সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজেট শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বা প্রতিরক্ষা নীতির বিষয় নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় আরও বাড়ানো ভবিষ্যতের কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।