প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝালকাঠীর নলছিটি পৌরসভায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, সরকারি অর্থ অপব্যবহার এবং অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ঘটনায় এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মিজানুজ্জামানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, বদলি ও রিলিজ স্থগিত, বেতন-ভাতা বন্ধ এবং অবসরোত্তর ভাতা (পেনশন) আটকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব নির্দেশনা বহাল থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের এ সিদ্ধান্তকে নলছিটির সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, অসম্পূর্ণ কাজ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ প্রশাসনের সক্রিয় উদ্যোগে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাওয়ায় সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ঝালকাঠীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক জুলিয়া সুকায়না নলছিটি পৌরসভা এবং নাচনমহল ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি, বাস্তবায়নের অবস্থা এবং অভিযোগের বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হন। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা ও অনিয়মের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি পৌরসভার প্রশাসককে সহকারী প্রকৌশলী মিজানুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পৌরসভার যেসব উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন না করেই সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, সেসব অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বদলি বা রিলিজ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে তার অবসরোত্তর ভাতা উত্তোলনও স্থগিত থাকবে। এছাড়া সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগে তার বেতন-ভাতাও সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সহকারী প্রকৌশলী মিজানুজ্জামানের বিরুদ্ধে ২০২০ সাল থেকেই একাধিক অনিয়মের অভিযোগ জমা হতে থাকে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর প্রায় ১০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজে ব্যাপক অনিয়ম এবং জলবায়ু ট্রাস্ট সহায়তা তহবিলের প্রায় দুই কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না করেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। অভিযোগগুলো বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উপস্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন কার্যকর তদন্ত বা দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এদিকে গত বুধবার ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় নলছিটি পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। সভায় জেলা প্রশাসক মমিনউদ্দিন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক জুলিয়া সুকায়নাকে অভিযোগগুলো সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনার পরদিনই তিনি নলছিটিতে গিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
পরিদর্শন শেষে অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নলছিটির বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পৌর এলাকার বিভিন্ন রাস্তা, ড্রেন এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক স্থানে বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের তথ্য থাকলেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তারা আশা করছেন, প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
স্থানীয় নাগরিকদের অনেকে জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং জনগণের করের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে জনদুর্ভোগ দূর করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও বিস্তারিত নিরীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়ন করা হবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে শুধু প্রশাসনিক নয়, আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই যেকোনো অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নলছিটি পৌরসভায় প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।