বিদেশি বিনিয়োগে বড় বাধা: সক্ষমতার সূচকে পিছিয়ে বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১৭ বার
বিদেশি বিনিয়োগে বড় বাধা: সক্ষমতার সূচকে পিছিয়ে বাংলাদেশ

প্রকাশ:  ২৪ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই অত্যন্ত কার্যকর ও শক্তিশালী একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য, উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে উন্নীত হওয়ার উদ্দেশ্যে এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য দেশের সামনে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাটাই বর্তমান সময়ে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শীর্ষ সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বা ফিকি তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ ‘এফডিআই রিপোর্ট-২০২৬’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ফিকির উদ্যোগে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজিত এই এফডিআই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সম্মেলনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের বিনিয়োগ খাতের বর্তমান করুণ চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে, তা জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ফিকির পক্ষ থেকে অত্যন্ত আশাবাদী একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, সঠিক নীতিগত সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশে এফডিআই আসার পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলারেরও অনেক নিচে অবস্থান করছে, যা দেশের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বর্তমানে দেশের এফডিআই ও জিডিপির অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশের ঘরে আটকে আছে, যা ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আড়াই শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে ফিকি। আঞ্চলিক অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে বিনিয়োগ সক্ষমতার বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই বাংলাদেশ আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ফিকির এই গবেষণামূলক প্রতিবেদনে লজিস্টিকস, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, শিল্পনীতি, বাণিজ্য একত্রীকরণ এবং করব্যবস্থা নামক মোট ছয়টি প্রধান সূচকের মধ্যে পাঁচটি সূচকেই বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে অত্যন্ত ‘দুর্বল’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা নীতিনির্ধারক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী লজিস্টিকস ও বাণিজ্য সহজীকরণ ব্যবস্থা, যে ক্ষেত্রে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিবেশীরা ‘শক্তিশালী’ অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ এখনও ‘দুর্বল’ পর্যায়ে পড়ে রয়েছে, আর ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া রয়েছে ‘মধ্যম’ অবস্থানে। বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে যেখানে ভারতের অবস্থান ৩৮তম এবং ভিয়েতনামের অবস্থান ৪৩তম স্থানে রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত পেছনে অর্থাৎ ৮৮তম স্থানে রয়েছে। একইভাবে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সুশাসনের ক্ষেত্রেও ভিয়েতনাম ও ভারত নিজেদের অবস্থান ‘শক্তিশালী’ হিসেবে ধরে রাখতে পারলেও বাংলাদেশ এই সূচকেও বেশ দুর্বল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে ভিয়েতনাম ২০২০ সালের অত্যন্ত আধুনিক ও যুগোপযোগী বিনিয়োগ আইন প্রণয়ন করলেও বাংলাদেশ আজও ১৯৮০ সালের সেই পুরোনো ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভরা ‘এফপিআইপিপিএ’ আইনের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে চলছে, যা আধুনিক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পনীতির ক্ষেত্রেও ভিয়েতনাম শক্তিশালী অবস্থানে এবং ভারত ও ইন্দোনেশিয়া মধ্যম অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ এখানেও দুর্বল এবং উচ্চ প্রযুক্তির শিল্পভিত্তিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বহু পেছনে পড়ে রয়েছে।

বাণিজ্য একত্রীকরণ এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নেটওয়ার্কের সূচকেও ভিয়েতনাম নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করেছে, যেখানে বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে ধুঁকছে। বাণিজ্য উন্মুক্ততা সূচকের দিকে তাকালে দেখা যায় যে ভিয়েতনামের আন্তর্জাতিক অবস্থান যেখানে ১৩তম স্থানে রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচে অর্থাৎ ১৫৫তম স্থানে গিয়ে ঠেকেছে। এছাড়া বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং করব্যবস্থা সূচকেও ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো যখন মধ্যম অবস্থানে রয়েছে, তখন বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া এই সূচকেও দুর্বল অবস্থানে পড়ে রয়েছে। দেশের প্রাতিষ্ঠানিক করহার কাগজে-কলমে সাড়ে সাতাশ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে বিদেশি বা দেশীয় উদ্যোক্তাদের কার্যকর করহার প্রায় তেতাল্লিশ থেকে আটচল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে, যা নতুন বিনিয়োগের পথে এক বিশাল ও অসহনীয় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের সক্ষমতা সূচকের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির বিষয় হলো বাংলাদেশ ‘মধ্যম’ অবস্থানে থেকে কম্বোডিয়ার সমকক্ষ হতে পেরেছে, যদিও ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া এই ক্ষেত্রটিতেও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনামে যেখানে বর্তমানে ৪৪টি এবং ভারতে ২৭৬টি কার্যকর অর্থনৈতিক অঞ্চল সচল রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কার্যকর অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংখ্যা মাত্র ১০টিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা অবকাঠামোগত প্রস্তুতির বড় ঘাটতি নির্দেশ করে।

এতসব প্রতিকূলতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও ফিকির প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে সঠিক কৌশল গ্রহণ করে এফডিআই আকর্ষণ করা সম্ভব হলে তা কেবল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রবাহকেই বাড়িয়ে দেবে না, বরং এটি আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এটি দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তথা কেবল তৈরি পোশাক খাতের ওপর দীর্ঘদিনের অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে শিল্প খাতের বৈচিত্র্যকরণে এবং উচ্চমূল্যের বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে এবং বিদেশি ঋণনির্ভর অর্থায়নের যে ঝুঁকি রয়েছে তা কমাতে এফডিআই এক অনন্য বিকল্প হতে পারে। এছাড়া সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ স্থানীয় বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড শিখতে সাহায্য করবে, যা প্রকারান্তরে দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং বিনিয়োগের সুনাম উন্নত করতে সাহায্য করবে। প্রথাগত তৈরি পোশাক খাতের বাইরেও দেশের ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং হালকা প্রকৌশল খাতে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসার সোনালী সম্ভাবনা রয়েছে।

ভবিষ্যতে বিনিয়োগের প্রধান উৎস হিসেবে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, চীন, সিঙ্গাপুর, ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়া শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও আসিয়ানভুক্ত সদস্য দেশগুলো এবং জাপানের মতো উন্নত অর্থনৈতিক শক্তির দেশগুলো থেকে আগামী দিনে আরও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আসার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কোরিয়ান বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা ও সম্পৃক্ততা দেশের এফডিআই খাতের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ফিকি। তবে এই সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করতে হবে, করব্যবস্থাকে সহজ ও বাস্তবসম্মত করতে হবে এবং পুরোনো আইনকানুন বাতিল করে যুগোপযোগী আধুনিক বিনিয়োগ আইন প্রণয়ন করতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এবং ব্যবসায়িক খাতের শীর্ষ সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে যদি এই সংস্কারগুলো ত্বরান্বিত করা যায়, তবেই বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার গ্লানি মুছে ফেলে বিদেশি বিনিয়োগের এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হতে পারবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত