প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি লিওনেল মেসি। প্রায় দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেওয়া এই মহাতারকার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের পর থেকেই প্রশ্ন উঠছিল, জাতীয় দলের হয়ে মেসির পথচলা কি এখানেই শেষ? অবশেষে আর্জেন্টিনার একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্পষ্ট সময়রেখার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিওনেল মেসি এখনই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিচ্ছেন না। তবে তিনি আর কোনো বিশ্বকাপে অংশ নেবেন না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জাতীয় দলে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ করে দিতে তিনি আরও কয়েক মাস আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন বলে জানা গেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো মেসি কিংবা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবুও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবেদনে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে পরাজয়ের পর সাংবাদিকরা তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করলেও মেসি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বরাবরের মতোই তিনি নিজের সিদ্ধান্ত প্রকাশে ধীরস্থির অবস্থান নিয়েছেন। তবে আর্জেন্টিনা দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি তখন স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলের দরজা মেসির জন্য সব সময় খোলা থাকবে। স্কালোনির ভাষায়, মেসি যত দিন খেলতে চাইবেন, আর্জেন্টিনা তাঁকে স্বাগত জানাবে।
তবে নতুন তথ্য বলছে, মেসি নিজের বিদায়ের সময়টা পরিকল্পিতভাবেই বেছে নিতে চান। হঠাৎ করে অবসর না নিয়ে তিনি চান, নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা তাঁর উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাক। ফুটবলে সফল দল গঠনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। সেই কারণেই বিদায়ের আগে আরও কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নামার সম্ভাবনা রয়েছে তাঁর।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও এই বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম beIN Sports-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেসির জন্য একটি জাঁকজমকপূর্ণ বিদায়ী ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা করছে এএফএ। সাধারণত কিংবদন্তি ফুটবলারদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট বা সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অবসরের ঘোষণা দেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের বিদায়কে ব্যতিক্রমী করে তুলতে চায় দেশটির ফুটবল কর্তৃপক্ষ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের মাধ্যমে লাখো সমর্থকের উপস্থিতিতে মেসিকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানো হতে পারে। সেই অনুষ্ঠানে বর্তমান ও সাবেক সতীর্থ, আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তারকা ফুটবলারদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে আর্জেন্টাইন ফুটবল অঙ্গনে এমন একটি আয়োজন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সেও নিজের অসাধারণ ফিটনেস ও পারফরম্যান্স দিয়ে আবারও বিশ্বকে মুগ্ধ করেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি আটটি গোল করার পাশাপাশি চারটি অ্যাসিস্ট করেন। গোলদাতাদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থেকে প্রমাণ করেন যে বয়স তাঁর প্রতিভা কিংবা প্রভাবকে একটুও কমাতে পারেনি। তাঁর নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেয়। যদিও শিরোপা জয়ের স্বপ্ন স্পেনের কাছে হেরে পূরণ হয়নি, তবুও পুরো টুর্নামেন্টে মেসির নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির যাত্রা ছিল সংগ্রাম, সমালোচনা এবং অবশেষে গৌরবের এক অনন্য গল্প। ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে টানা কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের ফাইনাল হেরে তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সমালোচকরা। ২০১৬ সালে একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। তবে ভক্তদের অনুরোধ এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে সেই সিদ্ধান্ত বদলে জাতীয় দলে ফিরে আসেন।
এরপরই বদলে যায় ইতিহাস। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২১ সালে দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে। ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে জেতে ফিনালিসিমা। একই বছরের কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে পূরণ হয় মেসির আজীবনের স্বপ্ন। এরপর ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জয় করে আর্জেন্টিনা। সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলকে ফাইনালে তুলে তিনি প্রমাণ করেন, আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা নেতা হিসেবে তাঁর ভূমিকা এখনো অটুট।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির অর্জনের তালিকা শুধু ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা, সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সর্বাধিক অ্যাসিস্টের রেকর্ড তাঁর দখলে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলকে একক নৈপুণ্যে জয় এনে দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং গোল করার ক্ষমতা আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত করেছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মেসির বিদায় শুধু আর্জেন্টিনার জন্য নয়, বিশ্ব ফুটবলের জন্যও একটি যুগের সমাপ্তি হবে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার, লুকা মদরিচ ও রবার্ট লেভানডোভস্কির মতো একই প্রজন্মের তারকাদের বিদায়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন যুগ শুরু হবে। সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রতীক হতে যাচ্ছেন মেসি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর সম্ভাব্য অবসর নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভক্তরা আশা করছেন, বিদায়ের আগে আরও কিছু ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাঠে নামবেন এই কিংবদন্তি। একই সঙ্গে তাঁরা চান, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড় যেন লাখো সমর্থকের উপস্থিতিতে প্রাপ্য সম্মান ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান।
যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি, তবে সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে পারে। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম দেওয়া লিওনেল মেসি হয়তো খুব শিগগিরই শেষবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামবেন। তবে তাঁর অর্জন, নেতৃত্ব এবং অনুপ্রেরণার গল্প ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।