প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল প্রখ্যাত নির্মাতা, সম্প্রচার সংগঠক এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের মৃত্যুতে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু একজন সফল প্রযোজক বা প্রশাসক ছিলেন না, বরং দেশের টেলিভিশন শিল্পের আধুনিক বিকাশে অন্যতম স্থপতি হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশি টেলিভিশন নাটক ও সম্প্রচারব্যবস্থা নতুন মাত্রা পেয়েছিল। রবিবার (২৬ জুলাই) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পরপরই গণমাধ্যম, সংস্কৃতি অঙ্গন এবং নাট্যজগতে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা খ ম হারুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক শোকবার্তায় তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। পরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বর্ণালী সময়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মোস্তাফিজুর রহমানের নাম। তিনি এমন এক সময় বিটিভিতে দায়িত্ব পালন করেছেন, যখন দেশের টেলিভিশন নাটক, বিনোদন অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। তাঁর পরিকল্পনা, নির্মাণশৈলী এবং শিল্প-সংবেদনশীলতা বিটিভিকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সম্প্রচারমাধ্যমে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁর প্রযোজনায় নির্মিত অসংখ্য নাটক আজও বাংলা নাটকের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এইসব দিনরাত্রি’ এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’ শুধু জনপ্রিয় নাটকই নয়, বরং বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের নান্দনিক বিকাশের অনন্য দলিল। এসব নাটকের মাধ্যমে দেশের মধ্যবিত্ত সমাজ, পারিবারিক সম্পর্ক, মানবিক মূল্যবোধ এবং সময়ের বাস্তবতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছিল। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও এসব নাটক এখনো দর্শকের কাছে সমানভাবে সমাদৃত।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, মোস্তাফিজুর রহমান নাটক নির্মাণে সবসময় গল্প, অভিনয়, নির্মাণমান এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ওপর গুরুত্ব দিতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি টেলিভিশন নাটক শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধের প্রতিফলন। সেই চিন্তা থেকেই তিনি নতুন নতুন নির্মাণধারা এবং সৃজনশীল উপস্থাপনার সুযোগ তৈরি করেছিলেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকেও তিনি সৃজনশীলতার বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর সময়েই অনেক নতুন অনুষ্ঠান, নাটক এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সম্প্রচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অনুষ্ঠান পরিকল্পনার বৈচিত্র্য এবং পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসরের পরও তিনি গণমাধ্যম থেকে দূরে সরে যাননি। বরং দেশের বেসরকারি টেলিভিশন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাভিশন এবং গাজী টিভি (জিটিভি) প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রচার কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয় অবদান দেশের টেলিভিশন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। নতুন প্রজন্মের দর্শকদের চাহিদা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং আধুনিক সম্প্রচারব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি যেভাবে কাজ করেছেন, তা দেশের গণমাধ্যমের বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
মোস্তাফিজুর রহমানের আরেকটি বড় পরিচয় ছিল একজন দক্ষ সংগঠক ও অভিভাবক হিসেবে। তাঁর হাত ধরেই দেশের অসংখ্য নির্মাতা, প্রযোজক, উপস্থাপক, সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমকর্মী পেশাগত জীবনের যাত্রা শুরু করেন। তিনি নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করতে সবসময় আগ্রহী ছিলেন এবং তরুণদের কাজের সুযোগ করে দিতে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতেন। অনেক প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা ও গণমাধ্যমকর্মী বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন যে তাঁদের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মোস্তাফিজুর রহমানের উৎসাহ ও দিকনির্দেশনা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সহকর্মীদের মতে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, দূরদর্শী এবং কর্মনিষ্ঠ একজন মানুষ। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধকেও সমান গুরুত্ব দিতেন। শিল্পী, কলাকুশলী কিংবা প্রযুক্তিকর্মী—সবাইকে সম্মান দিয়ে কাজ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ফলে কর্মস্থলে তিনি শুধু একজন কর্মকর্তা ছিলেন না, বরং একজন অভিভাবক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিটিভির স্বর্ণালী যুগ গড়ে ওঠার পেছনে যাঁদের নিরলস অবদান রয়েছে, তাঁদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান অন্যতম। তিনি এমন সময়ে কাজ করেছেন, যখন একটি মাত্র রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলই ছিল দেশের কোটি মানুষের বিনোদন, শিক্ষা ও তথ্যের প্রধান উৎস। সেই সময়ের অনুষ্ঠান নির্মাণে তাঁর সৃজনশীলতা এবং পরিকল্পনার কারণে বিটিভি শুধু একটি সম্প্রচারমাধ্যম নয়, বরং জাতীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল।
সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, তাঁর মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান। তবে তাঁর নির্মিত নাটক, গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান এবং রেখে যাওয়া অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সহকর্মীর মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানের ডিজিটাল সম্প্রচারব্যবস্থা, বহুমাত্রিক টেলিভিশন শিল্প এবং আধুনিক অনুষ্ঠান নির্মাণের যে ভিত্তি আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার পেছনে মোস্তাফিজুর রহমানের মতো অগ্রজদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও দূরদর্শী নেতৃত্ব রয়েছে। তাই তাঁর অবদান শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
মোস্তাফিজুর রহমানের প্রয়াণে দেশের টেলিভিশন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন একজন অভিজ্ঞ নির্মাতা, দূরদর্শী সংগঠক এবং মানবিক অভিভাবককে হারাল। তবে তাঁর সৃষ্টি, কর্ম এবং আদর্শ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তাঁর নির্মিত কালজয়ী নাটকগুলো যেমন নতুন প্রজন্মের দর্শকদের অনুপ্রাণিত করবে, তেমনি গণমাধ্যমে তাঁর রেখে যাওয়া অবদান ভবিষ্যতের নির্মাতা ও সম্প্রচারকর্মীদের পথ দেখাবে।