ইতালির কোচ হওয়ার আগে বিতর্কে পিরলো

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
ইতালির কোচ হওয়ার আগে বিতর্কে পিরলো

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইতালি জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ নিয়োগকে ঘিরে নাটকীয়তা দিন দিন বাড়ছে। ২০০৬ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি মিডফিল্ডার আন্দ্রেয়া পিরলোকে ইতালির নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হলেও, রাশিয়ার একটি অনলাইন জুয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর বাণিজ্যিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ফুটবল মাঠে অসাধারণ সাফল্যের জন্য বিশ্বজুড়ে সম্মানিত এই সাবেক তারকা এখন কোচ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক, নৈতিক এবং ক্রীড়া প্রশাসনিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন।

ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (এফআইজিসি) এখনো নতুন কোচের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। তবে দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ৪৭ বছর বয়সী পিরলোকে জেনারো গাত্তুসোর উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা ইতালির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন বলে জানা যাওয়ার পর পিরলোর সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই সামনে আসে তাঁর রাশিয়ার অনলাইন বেটিং প্রতিষ্ঠান ফনবেটের (Fonbet) সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি।

বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইউনাইটেড এফসির প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিরলো। গত বছরের অক্টোবরে তিনি ফনবেটের বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হিসেবে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করেন। এরপর মস্কোর ঐতিহাসিক লুঝনিকি স্টেডিয়ামে প্রতিষ্ঠানটির একটি প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে ইতালির আরেক বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার মার্কো মাতেরাজ্জির সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি নতুন করে সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান চলমান অবস্থায় এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ইতালির রাজনৈতিক মহল এবং ক্রীড়াঙ্গনের একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, পিরলোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফেডারেশন চায়, জাতীয় দলের নতুন কোচ নিয়োগের আগে সম্ভাব্য সব বিতর্ক এবং এর প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হোক।

বিতর্কের মুখে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন আন্দ্রেয়া পিরলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাঁর পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবেই ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি বাণিজ্যিক এবং ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট চুক্তি। তাঁর ভাষায়, বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয় এবং এটি তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন নয়।

পিরলো আরও বলেন, একটি সাধারণ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তকে এত দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ দেওয়া তাঁকে হতাশ করেছে। তিনি মনে করেন, একজন ক্রীড়াবিদের পেশাগত কাজকে সবসময় রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। তবে তাঁর এই ব্যাখ্যা সমালোচকদের অবস্থান খুব একটা পরিবর্তন করতে পারেনি।

ইতালির রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট পিনা পিচিয়ের্নো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালিয়ান ফুটবল যেভাবে ধারাবাহিক ব্যর্থতার মুখে পড়েছে, বিশেষ করে টানা দুইবার বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে না পারার পর দেশের ফুটবলে সাংস্কৃতিক, নৈতিক এবং ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে পিরলোকে নিয়োগ দেওয়া সেই পরিবর্তনের বার্তা বহন করে না।

ইতালির সিনেটের সভাপতি ইগনাজিও লা রুসসাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, পিরলো নিঃসন্দেহে ইতালির ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার। কিন্তু একজন কোচ হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক বিতর্ক বিবেচনায় জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাঁর মন্তব্য ইতালির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

অন্যদিকে ইতালির শীর্ষ ক্রীড়া দৈনিক লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ট জানিয়েছে, জাতীয় দলের নতুন কারিগরি পরিচালক পাওলো মালদিনি পিরলোর নিয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পত্রিকাটির দাবি, যদি শেষ পর্যন্ত বিতর্কের কারণে পিরলোর নিয়োগ আটকে যায়, তাহলে মালদিনি নিজেও পদত্যাগের কথা বিবেচনা করতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, পিরলোর খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার তাঁকে ইতালির অন্যতম সফল ফুটবল ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। এসি মিলান, জুভেন্টাস এবং ইতালি জাতীয় দলের হয়ে তিনি অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন। ২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইতালির শিরোপা জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি। মাঠে তাঁর অসাধারণ পাসিং, কৌশলগত দক্ষতা এবং নেতৃত্ব তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে কোচ হিসেবে তাঁর পথচলা তুলনামূলকভাবে মিশ্র। জুভেন্টাসের দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইতালিয়ান কাপ ও সুপার কাপ জিতলেও সিরি আ শিরোপা ধরে রাখতে পারেননি। পরে তুরস্কের ফাতিহ কারাগুমরুক এবং বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইউনাইটেড এফসিতে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে জাতীয় দলের মতো বড় দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ইতালিয়ান ফুটবল বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১৮ ও ২০২২—টানা দুই বিশ্বকাপে মূল পর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর দলটি নতুন করে নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। সেই লক্ষ্যেই নতুন কোচ নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু কৌশলগত দক্ষতা নয়, নেতৃত্ব, গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতীয় দলের ভাবমূর্তিও এই নিয়োগে বড় ভূমিকা রাখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পিরলোকে ঘিরে চলমান বিতর্ক ইতালিয়ান ফুটবলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—জাতীয় দলের কোচ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে তাঁর ফুটবলীয় সাফল্য এবং জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে বিতর্কিত বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনকে।

এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। পিরলো কি শেষ পর্যন্ত ইতালির নতুন প্রধান কোচ হবেন, নাকি বিতর্কের কারণে অন্য কোনো প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়া হবে—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, জাতীয় দলের কোচ নিয়োগের প্রক্রিয়া এখন আর শুধু ফুটবলীয় বিবেচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নৈতিকতা, কূটনীতি এবং জনমতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত