সর্বশেষ :

হবিগঞ্জে হামলার প্রতিবাদে বুধবার রাজপথে নামছে এনসিপি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ২৬ বার
হবিগঞ্জে হামলার প্রতিবাদে বুধবার রাজপথে নামছে এনসিপি

প্রকাশ: ২৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে, যার নির্মম শিকার হচ্ছে উদীয়মান রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্ব। গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জ জেলায় জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির পূর্বঘोषित ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে, তা গোটা দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সুশৃঙ্খল গাড়িবহরে পরিকল্পিত হামলা, নেতাকর্মীদের ওপর পৈশাচিক মারধর এবং অবরুদ্ধ করে রাখার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দলটি। এই বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অবিলম্বে বুধবার দেশের প্রতিটি মহানগরে, জেলায়, উপজেলায় এবং থানায় সর্বাত্মক বিক্ষোভ সমাবেশের কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় এনসিপি।

পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার দিকে হবিগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী টাউন হল চত্বরে এনসিপির বহুল প্রতীক্ষিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ উপলক্ষে এক বিশাল জনসভা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সমাবেশে প্রধান বক্তা ও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও পরিচিত মুখ সারজিস আলমসহ দলের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতারা। দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কার, সুশাসন ও অধিকার আদায়ের প্রত্যয় নিয়ে আয়োজিত এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের মধ্যেও বেশ উৎসাহ লক্ষ করা গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে এক অনভিপ্রেত সহিংস পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মর্মান্তিক সমাপ্তির দিকে গড়ায়।

সমাবেশ সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়বহরটি শহরের সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু পথিমধ্যে স্টাফ কোয়ার্টার এলাকা অতিক্রম করার সময় হঠাৎ করেই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাঁর বহনকারী গাড়িটিকে লক্ষ্য করে অতর্কিত ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। আকস্মিক এই হামলার মুখে চালক চরম সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে কোনোমতে সার্কিট হাউসে গিয়ে আশ্রয় নেন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দুর্বৃত্তরা পেছনে থাকা এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়িকেও ধাওয়া করে এবং মুহুর্মুহু ইটপাটকেল ছুড়ে গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সারজিস আলমের গাড়িটি দ্রুত শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সোনালী ব্যাংক ভবনের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ঢুকে পড়ে।

খবর পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে ছাত্রদলের একদল উত্তেজিত নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে ছুটে এসে ওই ব্যাংক ভবনটি চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে এবং ভেতরে থাকা নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। ব্যাংক ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন সারজিস আলমসহ দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী, যার ফলে এলাকায় চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই উত্তেজনার পর অবশেষে রাত আটটার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে সারজিস আলমকে নিরাপদে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে পৌঁছে দেয়। কিন্তু ততক্ষণে হবিগঞ্জ শহরের মূল সড়কগুলোতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের চলাফেরা সম্পূর্ণ থমকে যায়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও এনসিপির দায়িত্বশীল নেতাদের অভিযোগ, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করেননি। এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এনসিপির অফিসিয়াল মিডিয়া টিম বহনকারী একটি মাইক্রোবাস যখন সার্কিট হাউসের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে যায়, তখন ক্ষিপ্ত হামলাকারীরা সেখানে চড়াও হয়ে গাড়িটি ব্যাপক ভাঙচুর করে। শুধু গাড়ি ভাঙচুরই ক্ষান্ত হয়নি, তারা সেখানে উপস্থিত সংবাদকর্মী ও মিডিয়া টিমের সদস্যদের ওপরও শারীরিক আক্রমণ চালায় এবং তাদের পেশাগত কাজে ব্যবহৃত একাধিক মুঠোফোন ও দামি ক্যামেরা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও এবং বিবৃতির মাধ্যমে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন যে, হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের একদল সন্ত্রাসী নেতা-কর্মী হকিস্টিক, রামদা, লোহার শিকল ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে ও বহরে হামলা চালিয়েছে। তিনি দাবি করেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে তাদের মিডিয়া টিমের সদস্য, গাড়িচালক এবং অনেক স্থানীয় নেতাকর্মী গুরুতর জখম হয়েছেন। হামলায় অনেক নেতাকর্মীর হাত-পা ভেঙে গেছে এবং তাদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেথ করেন। এই পৈশাচিক হামলা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম অবনতির বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে, এই হামলার তীব্র খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এনসিপির সাধারণ নেতাকর্মীরাও প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষের সময় হবিগঞ্জ শহরের প্রধান প্রধান সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ পথচারী ও দোকানপাটের মালিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দফায় দফায় চলা এই সংঘর্ষ ও হামলায় উভয় পক্ষের অন্তত পনেরো জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। দেশের একটি নতুন রাজনৈতিক দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলাকালে এই ধরনের সশস্ত্র আক্রমণ সুস্থ রাজনীতির বুনিয়াদকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

সংঘাতের এই ঘটনার পর হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন যে, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের সমাবেশে অত্যন্ত উসকানিমূলক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। তাঁর মতে, ওই বক্তব্যে উসকানি পাওয়ার পরেই স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতির চাপে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, মতাদর্শের ভিন্নতা বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য যাই থাকুক না কেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এই ধরনের সশস্ত্র হামলা এবং ক্যাডারভিত্তিক তাণ্ডব কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব এবং সহাবস্থানের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার ফলেই আজকের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে মঙ্গলবার গভীর রাতেই কেন্দ্রীয় এনসিপির পক্ষ থেকে এক জরুরি সাংগঠনিক নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শেয়ার করা ওই নির্দেশনায় হবিগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর চালানো এই নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে এই বর্বরোচিত ঘটনার প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে দোষী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে বুধবার সারা দেশব্যাপী দলীয়ভাবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় এনসিপির সমস্ত মহানগর, জেলা, উপজেলা এবং থানা শাখাকে নিজ নিজ এলাকায় সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজনের জন্য কড়া নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব সাংগঠনিক ইউনিটকে এই কর্মসূচি সফল ও শৃঙ্খলিতভাবে বাস্তবায়নের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আজকের এই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে এখন তীব্র আলোচনা ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। হবিগঞ্জের এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের গণতন্ত্র ও সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা টিকিয়ে রাখতে সব দলের পারস্পরিক সহনশীলতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত