ভারতের মুদ্রায় বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চায় রাশিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
ভারতের মুদ্রায় বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চায় রাশিয়া

প্রকাশ: ২৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের আরোপিত বিভিন্ন কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় রুশ ব্যাংকগুলোর জন্য যে তীব্র জটিলতা ও সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার নতুন পথ খুঁজছে মস্কো। এই পরিস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য নিষ্পত্তির একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব প্রদান করেছে রুশ সরকার। শুধু তাই নয়, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেন আরও সহজ ও গতিশীল করতে একটি সম্পূর্ণ পৃথক এবং স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের নতুন শাখা চালুর দীর্ঘদিনের পুরনো প্রস্তাবটিও নতুন করে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে মস্কো। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে যে, আগামী সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ-রাশিয়া ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কোঅপারেশন-এর আসন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে এবং বৈঠকের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা চূড়ান্ত করতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রচলিত ডলারে লেনদেন কার্যত প্রায় পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিকল্প অর্থ পরিশোধ বা সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা চালুর অংশ হিসেবেই ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য সম্পাদনের প্রস্তাবটি দিয়েছে ক্রেমলিন। ইতিপূর্বে ভারত ও রাশিয়া কোনো আনুষ্ঠানিক কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি ছাড়াই তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় মুদ্রায় পরিচালনা করে সফল হয়েছে। বাংলাদেশও ইতিমধ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে মার্কিন ডলারের পাশাপাশি নিজস্ব বাণিজ্যের একটি অংশ ভারতীয় রুপিতে নিষ্পত্তি করে আসছে। ফলে প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগতভাবে এই পদ্ধতিটি বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু না হলেও, রাশিয়ার মতো একটি পরাশক্তির সঙ্গে এই ব্যবস্থার প্রবর্তন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে একটি নতুন ও ব্যতিক্রমী অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দ্বিপাক্ষিক আর্থিক লেনদেনের এই জটিলতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর অন্যতম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়ার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রকল্পটির ঋণের কিস্তির বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়মমাফিক রাশিয়ায় পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। সংকট উত্তরণে এর আগে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করার একটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নিষেধাজ্ঞাজনিত তীব্র ঝুঁকির আশঙ্কায় চীন ও বাংলাদেশের স্থানীয় ব্যাংকগুলো সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নে কোনো ধরনের আগ্রহ দেখায়নি। বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার নামে বিশেষভাবে খোলা একটি ব্যাংক হিসাবেই ঋণের কিস্তির ওই অর্থ জমা রাখা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকায় সেই জমা হওয়া অর্থ কোনোভাবেই রাশিয়ার ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। ইআরডি সূত্র আরও জানিয়েছে যে, সোনালী ব্যাংকে আটকে থাকা ওই অর্থ বাংলাদেশেই পুনর্বিনিয়োগ করার একটি প্রস্তাব ঢাকাকে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মস্কো সেই প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করেনি।

বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ঢাকা ও মস্কোর মধ্যে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করতে একটি ‘রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে রুশ পক্ষ। একই সঙ্গে রাশিয়ার আমদানিকারক ও ক্রেতাদের জন্য নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের একটি সুনির্দিষ্ট ও নিবন্ধিত তালিকা তৈরিরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি দুই দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সার্বিক সহায়তা প্রদানের জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেছে বিশ্বের বৃহত্তম এই দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধিদল। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠ মিত্রতার সম্পর্ক থাকলেও রাশিয়ার বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনার পুরো সুফল আজও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবির সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি ছিল। কিন্তু যুদ্ধ ও পরবর্তী বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই রপ্তানি প্রবাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় মোটে ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার মূল্যের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে রাশিয়া থেকে সার, গম এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য আমদানি করে চলেছে। আসন্ন আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করার বিষয়ের ওপর, যা দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে।

প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা সুদৃঢ়করণ, ই-কমার্স, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং অত্যাধুনিক উদ্ভাবন বা ইনোভেশন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া কৃষি খাতের উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার, যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন, কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগ এবং লজিস্টিকস খাতের আধুনিকায়ন নিয়ে বৈঠকে গভীর আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ২০১৭ সালে এই যৌথ কমিশন গঠিত হয়েছিল। এই কমিশনের সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ, এবং এর আগে ২০১৮ সালে মস্কো, ২০১৯ সালে ঢাকা এবং ২০২১ সালে মহামারির সময়ে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সভাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দামে ইউরিয়া সার সরবরাহের একটি আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ভিয়াচেস্লাভ সেন্টিউরিনের নেতৃত্বে সাক্ষাৎ করতে আসা প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। রুশ পক্ষ থেকে সরকার-টু-সরকার বা জি-টু-জি ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসিকে প্রায় দুই লাখ আশি হাজার টন উচ্চমানের ইউরিয়া সার সরবরাহের আন্তরিক আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। সারের পাশাপাশি সূর্যমুখী তেল, হলুদ মটরশুঁটি, ছোলা, লাল মসুর এবং সবুজ মসুর ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহের নতুন প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি।

এ ছাড়া ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবি এবং রাশিয়ার জেএসসি এফইসি প্রোডিনটর্গের মধ্যে ইতিপূর্বে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আলোকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। এই প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও সুবিধার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, সরাসরি বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বহুগুণ সম্প্রসারণ করতে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকটের এই সময়ে রাশিয়ার এই বহুমুখী প্রস্তাব এবং বাংলাদেশের কৌশলগত কূটনৈতিক পদক্ষেপ দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এক নতুন গতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত