প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামুদ্রিক ও কারিগরি বিভিন্ন জটিলতার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে এক গভীর সংকট ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ হঠাৎ করে বিকল হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সপ্তাহেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের নিবিড় তত্ত্বাবধানেও টার্মিনালটি সচল করা সম্ভব না হওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এই অপ্রত্যাশিত জ্বালানি ঘাটতির ফলে একদিকে যেমন শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে চুনা জ্বলছে না বললেই চলে, যা জনজীবনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
গত ২১ জুলাই থেকে মহেশখালীর ওই ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে হঠাৎ করে গুরুতর কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয় এবং এর ফলে টার্মিনালটি থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই একটিমাত্র টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় চারশত পঞ্চাশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো, যা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে গ্যাসের বিশাল এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘাটতির নেতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে দেশের আবাসিক খাতের পাশাপাশি ভারী ও মাঝারি শিল্প-কারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর। গ্যাসের এই মারাত্মক স্বল্পতার কারণে রাজধানী ঢাকা এবং এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা গ্যাস সরবরাহের দাবিতে ইতিমধ্যে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও তীব্রতা গভীরভাবে অনুধাবন করে বর্তমান সরকার এবং খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকট উত্তরণে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কূটনৈমিতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার কারিগরি সহায়তা চেয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিঠি প্রেরণ করেছেন। শুধু চিঠিপত্র পাঠানোর মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি টেলিফোনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে জরুরি ভিত্তিতে তাদের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেছেন। সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে সরাসরি সফর করে প্রধানমন্ত্রীর সেই বিশেষ চিঠি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের কথা শুনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সহানুভূতিশীল মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর দেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পূর্ণ আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, এই আকস্মিক সংকট নিরসনে মালয়েশিয়া যেকোনো ধরনের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তিনি তাঁর দেশের বিশেষজ্ঞ টিম ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন এবং তা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন। এছাড়া ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি এলএনজি আমদানির সম্ভাবনা নিয়েও দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
এদিকে সচিবালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দেশের চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত সার্বিক পদক্ষেপগুলো গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি আবারও আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, এফএসআরইউতে অপ্রত্যাশিত সমস্যা দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। গ্যাস সংকটের দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সমাধানের অংশ হিসেবে সরকার কেবল মালয়েশিয়া নয়, বরং অন্যান্য বিকল্প উৎস ও দেশগুলোর সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ রাখছে। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টার নেতৃত্বে আসা একটি উচ্চপর্যায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান যে, এই সংকট দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাটিয়ে ওঠার জন্য জ্বালানি ও সংশ্লিষ্ট খনিজ সম্পদ বিভাগ এক্সেলারেট এনার্জির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ টিমের দিনরাত পরিশ্রমের ফলে আশা করা হচ্ছে যে, আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকেই দৈনিক অন্তত দুইশত আশি থেকে তিনশত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পুনরায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আর তার ঠিক পরবর্তী সপ্তাহের শেষ নাগাদ মহেশখালীর ওই ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত সম্পন্ন করে আগের মতো সচল করা সম্ভব হবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। ততদিন পর্যন্ত দেশবাসীকে কিছুটা ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ জানিয়ে জ্বালানি বিভাগ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, জাতীয় পর্যায়ে এই বড় সংকটের সরাসরি প্রভাবে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমণ্ডি ও এর আশেপাশের এলাকার লাখ লাখ বাসিন্দা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর ও আদাবরের বিভিন্ন এলাকায় তিতাস গ্যাসের সরবরাহ দিনের পর দিন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রান্নাবান্না থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী অধিবাসীদের অভিযোগ, দিনের বেলায় চুলার কাছে গ্যাস পাওয়ার কোনো উপায় থাকে না, আর গভীর রাতে যখন কদাচিৎ গ্যাস আসে, তখন গ্যাসের চাপ এত বেশি কম থাকে যে তা দিয়ে কোনো কাজই করা যায় না। দীর্ঘ এক বছর ধরে গ্যাস লাইনে ত্রুটি, পাইপে পানি জমে থাকা এবং গ্যাসের স্বল্পচাপের মতো সমস্যা চলতে থাকলেও গত এক মাস ধরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় তিতাস অফিস ও মন্ত্রণালয়ে বারবার ধরনা দিয়েও কোনো ধরনের সুরাহা বা প্রতিকার না পাওয়ায় এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে আগামী শুক্রবার একটি বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং নগর উন্নয়ন ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিবাদ কর্মসূচি সফল করতে মোহাম্মদপুরের রিং রোডে অবস্থিত জাপান গার্ডেন সিটির সামনে থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মিছিল করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এলাকার তীব্র গ্যাস সংকট নিরসনে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি আকুল আবেদনপত্র এবং তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সুনির্দিষ্ট স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও স্থানীয় জনগণের এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তিতাস কর্তৃপক্ষ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। সব মিলিয়ে, মহেশখালীর টার্মিনাল সচল হওয়ার মধ্য দিয়ে এই গ্যাস সংকটের অবসান ঘটবে এবং নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের চিরতরে অবসান হবে—এমনটাই এখন দেশের আপামর জনসাধারণের একমাত্র প্রত্যাশা।