প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকা শহরকে অপরাধমুক্ত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপির পক্ষ থেকে নিয়মিত বিশেষ অভিযান ও চিরুনি তল্লাশি পরিচালনা করা হয়ে থাকে। অপরাধ দমনে পুলিশের এই কঠোর অবস্থান অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িতদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ভীতির সঞ্চার করেছে এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক আশাব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানী জুড়ে পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার সাঁড়াশি অভিযানে রেকর্ড সংখ্যক অপরাধীকে পাকড়াও করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ও ধারাবাহিক তল্লাশির মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে অপরাধের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে সর্বমোট পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা অপরাধ দমনের ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বুধবার সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে প্রেরিত একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেশবাসীকে অবহিত করা হয়েছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ থেকে পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে যে, রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে অত্যন্ত সফলভাবে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যেই মূলত এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। দিনভর পরিচালিত এই ব্যাপক অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো, যার ফলে অপরাধীরা পার পাওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি।
ডিএমপির প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাজধানীর বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিচালিত এই অভিযানে সর্বমোট পাঁচ শতাধিক তিন জন অর্থাৎ ৫০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক গ্রেপ্তারকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে মোট ত্রিশটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের অপরাধের তীব্রতা ও মাত্রা অনুযায়ী গ্রেপ্তারকৃতদের সংখ্যাও বিভিন্ন বিভাগে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। ডিএমপির অধীনে থাকা বিভিন্ন জোনের মধ্যে বিশেষ করে অপরাধপ্রবণ ও জনবহুল এলাকাগুলোতে পুলিশের তৎপরতা বেশি থাকায় কিছু নির্দিষ্ট বিভাগে গ্রেপ্তারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।
ডিএমপির মিডিয়া বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার রমনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টার অভিযানে মোট চৌত্রিশ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত লালবাগ বিভাগে এই সংখ্যাটি ছিল পঁয়ত্রিশ জন। পুরনো ঢাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ওয়ারী বিভাগে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মোট একচল্লিশ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকা হিসেবে খ্যাত মতিঝিল বিভাগে অপরাধ দমনের অভিযানে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়তা দেখা গেছে, যেখান থেকে সর্বমোট বিরাশি জন সন্দেহভাজন অপরাধীকে পুলিশ আটক করেছে। পাশাপাশি তেজগাঁও বিভাগে পিয়াত্তর জন এবং মিরপুর বিভাগে অপরাধের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে সর্বোচ্চ একশো বাইশ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা রাজধানীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশ উল্লেখযোগ্য।
এর পাশাপাশি অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান বিভাগে আঠারো জন এবং উত্তরা জোনের বিভিন্ন থানা এলাকায় সুনির্দিষ্ট অভিযানে উনসত্তর জন অপরাধীকে পাকড়াও করা হয়েছে। শুধু থানা পুলিশই নয়, এর পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বা ডিবি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে এই সার্বিক অভিযানে আটজন কুখ্যাত অপরাধীকে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আটক করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলতে থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা বিভাগের এই সমন্বিত ও গোছানো অভিযান সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। অপরাধীরা যত কৌশলীই হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি ও পেশাদারিত্বের কারণে তারা যে রক্ষা পাচ্ছে না, এই পরিসংখ্যান তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করাই নয়, বরং এই সাঁড়াশি অভিযانের সময় পুলিশের জালে ধরা পড়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাদকদ্রব্য, মূল্যবান সামগ্রী এবং চোরাই সম্পত্তি। ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গ্রেপ্তারকৃতদের হেফাজত থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকানো অবস্থায় মোট একশো সাত কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে, যা মাদকের বিরুদ্ধে ডিএমপির জিরো টলারেন্স নীতির একটি বড় সাফল্য। সজাগ দৃষ্টি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়েছে পঁচিশ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটও। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে এবং মাদকের চালান রাজধানীতে ঢোকার পথগুলো বন্ধ করতে পুলিশ প্রশাসনের এই ধারাবাহিক ও কঠোর অবস্থান অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হচ্ছে।
মাদকের পাশাপাশি অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে আট ভরি তেরো আনা পাঁচ রতি ওজনের বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান স্বর্ণালংকার, যা বিভিন্ন অপরাধ বা চুরির ঘটনায় ব্যবহৃত কিংবা লুণ্ঠিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপরাধীদের কাছ থেকে যোগাযোগ ও অপরাধ সংগঠনের কাজে ব্যবহৃত মোট নয়টি আধুনিক মুঠোফোনও জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া অপরাধের কাজে ব্যবহৃত দুটি পুরাতন মোটরসাইকেলও উদ্ধার করেছে পুলিশ। সবচেয়ে বড় মানবিক ও সফল দিক হলো, এই সাঁড়াশি অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একজন অপহৃত বা নিখোঁজ ভিকটিমকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, যা পুলিশ প্রশাসনের মানবিক দায়িত্ববোধের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট পরিচালনা এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক অভিযানের মাধ্যমে এই অপরাধীদের পাকড়াও করা হয়েছে বলে ডিএমপি জানিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত এই সমস্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণের কাজ ইতোমধ্যে জোরেশোরে শুরু হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং আদালতের মাধ্যমে তাদের রিমান্ড কিংবা জেলহাজতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অপরাধের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস না করে রাজধানীর শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ডিএমপির এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও আরও জোরদার করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করেন যে, রাজধানী ঢাকাকে প্রকৃত অর্থেই একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পুলিশের এই ধরনের নিয়মিত ও সাঁড়াশি অভিযানের কোনো বিকল্প নেই। ছিনতাই, রাহাজানি, মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের কঠোর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ডিএমপির এই চব্বিশ ঘণ্টার সফল অভিযানে অর্ধশতাধিক অপরাধীর গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাই মাল উদ্ধারের ঘটনা নগরবাসীর মনে নতুন করে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। অপরাধীদের শিকড় গভীরে প্রোথিত থাকলেও আইনের কঠোর শাসন ও পুলিশের পেশাদারিত্বের কাছে যে তারা টিকতে পারবে না, এই সফল অভিযান তারই সুদৃঢ় বার্তা দিচ্ছে।