হবিগঞ্জে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, ১৪৪ ধারা জারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ১২ বার
হবিগঞ্জে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, ১৪৪ ধারা জারি

প্রকাশ: ২৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং জননিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি আহ্বান করার ফলে সেখানে চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং জনমালের অপক্ষয় রোধ করতে শেষ পর্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা এড়ানোর লক্ষ্যে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির কঠোর বিধান অনুযায়ী ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, যার ফলে সমগ্র এলাকায় সভা-সমাবেশ ও জমায়েতের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. জি এম সরফরাজ স্বাক্ষরিত এক জরুরি দাপ্তরিক আদেশের মাধ্যমে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় এই ১৪৪ ধারা জারির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ওই আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির পক্ষ থেকে পৌর এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও পদযাত্রা কর্মসূচি পালনের ব্যাপক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর বিপরীতে ঠিক একই সময়ে এবং প্রায় কাছাকাছি স্থানে হবিগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপি, পৌর বিএনপি এবং জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অবস্থান কর্মসূচি পালনের পৃথক ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সময় এবং একই স্থানে দুটি বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দলের এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি আহ্বানের ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় ধরনের সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির প্রবল আশঙ্কা দেখা দেয়।

জনশৃঙ্খলা পুরোপুরি রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৪ ধারার অর্পিত ক্ষমতাবলে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই আদেশের আওতায় পৌর এলাকায় যেকোনো ধরনের পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির একত্রিত হওয়া, জনসভা করা, মিছিল বা শোভাযাত্রা বের করা, অবস্থান কর্মসূচি পালন, পিকেটিং করা, মাইকিং করা, স্লোগান দেওয়া এবং উচ্চ শব্দে যেকোনো ধরনের প্রচারণা চালানোর ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করতে পারে এমন যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক কার্যক্রম থেকেও সবাইকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই কড়া নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রশাসনের এই নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।

হবিগঞ্জে বর্তমান এই চরম উত্তেজনার মূল সূত্রপাত হয়েছিল এর আগের দিন অর্থাৎ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। সেদিন হবিগঞ্জ পৌর শহরের থানার মোড় ও সার্কিট হাউস এলাকায় এনসিপির পূর্বঘोषित ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি থেকে ফেরার সময় স্থানীয় নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এনসিপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এই হামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতা ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এবং মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ অন্তত দশজন নেতাকর্মী গুরুতরভাবে আহত হন। এ সময় এনসিপি বহরের বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং সংবাদকর্মীদের ওপরও চড়াও হওয়া হয়। এই ঘটনার পর থেকেই পুরো শহরজুড়ে উত্তেজনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাপাল্টি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকে হবিগঞ্জ টাউন হলের সামনে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কিছু কঠোর ও সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাধ্যমে দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় এবং সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই এর সঙ্গে জড়িত। এর আগে একই দিনে জেলার আজমিরীগঞ্জে এক পথসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সারজিস আলম অভিযোগ করেন যে বর্তমান সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের রাজনৈতিক সংঘাতে দেশজুড়ে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যার একটি বড় অংশই ঘটেছে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে। এই ধরনের কড়া বক্তব্যের পরেই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়।

সংঘর্ষের তীব্রতা বেড়ে গেলে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা জীবন বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী সোনালী ব্যাংক ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেন এবং পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স এসে তাদের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেই তাদের ওপর হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ পাল্টা দাবি করে গণমাধ্যমকে জানান যে এনসিপির নেতারা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে শান্ত শহরকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছেন, আর এই ঘটনার সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই, বরং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বর্তমান এই সার্বিক পরিস্থিতিতে হবিগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত