প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে হামলা, প্রতিবাদ কর্মসূচি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে উঠেছে। গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ ওঠার পর থেকেই পরিস্থিতি অবনতির দিকে যায়। ধারাবাহিক এই রাজনৈতিক সংঘাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করলেও থেমে থাকেনি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও সংঘাত। হবিগঞ্জে ঢুকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বসে মামলা দায়ের করতে বাধ্য হন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির পূর্বঘোষিত পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে। সেখানে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা হামলার শিকার হন। এই ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে এনসিপি তাৎক্ষণিকভাবে হবিগঞ্জে একটি প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয়। তবে একই স্থানে ছাত্রদলও পাল্টা সমাবেশ আহ্বান করলে জেলা প্রশাসন শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এই পরিস্থিতিতে পূর্বনির্ধারিত প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে দলের আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার হয়ে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন।
মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে শ্রীমঙ্গলের চা-কন্যা নামক স্থানে পুলিশের প্রথম দফার বাধার মুখে পড়েন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এনসিপির নেতাদের প্রতিহত করতে অবস্থান নিয়েছে। দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা এড়াতে পুলিশ তাদের মৌলভীবাজারে কর্মসূচি পালনের অনুরোধ জানায়। তবে সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে এনসিপি নেতারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে হবিগঞ্জের দিকে এগিয়ে যান। পরবর্তীতে রশিদপুর এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ আবারও তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়। টানা চার ঘণ্টা আটকে রাখার পর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত আটটার দিকে বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বসে সদর থানায় মামলা করতে বাধ্য হন এনসিপির নেতাকর্মীরা। হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল সভাপতি শাহ রাজীব আহমেদ রিংগনসহ এগারো জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও এক শ জনকে আসামি করে এই মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার বাদী হন জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তানভীর রুয়েল। মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শেষে রাত নয়টার দিকে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা মৌলভীবাজারের পথে ফিরে যান।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অভিযোগ করেন যে, বিকেল সাড়ে চারটা থেকে পুলিশ তাদের শান্তিপূর্ণ গাড়িবহর অন্যায়ভাবে আটকে রাখে। সন্ধ্যা সাতটায় তাঁরা হবিগঞ্জ থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলেও পুলিশ তাতে বাধা দেয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে পুলিশের একটি ফাঁড়িতে বসে মামলা দায়ের করতে হয়েছে। তাঁর দাবি, পুলিশ প্রশাসন সরকারি দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের রক্ষা করতে এবং এনসিপির শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতেই এই ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে, কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং বিকেলে হবিগঞ্জ শহরে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে প্রতিবাদ সভা করে জেলা যুবদল। হবিগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ জানিয়েছেন, এনসিপি ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চেষ্টা থেকে যেকোনো ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতেই পুলিশ এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিল।
হবিগঞ্জের পাশাপাশি চট্টগ্রামেও এনসিপি ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। বিকেলে নগরের চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা থেকে হাতাহাতির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যে প্রেস ক্লাবের আশপাশের সকল দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন মালিকরা। ব্যস্ততম ওই সড়কে কিছুক্ষণের জন্য যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে থেমে থাকেনি প্রতিবাদ, রাতে চট্টগ্রামেই একটি মশাল মিছিল বের করে এনসিপির নেতাকর্মীরা।
এদিকে সিলেটে একটি স্থানীয় হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে এনসিপি সিলেট জেলার আহ্বায়ক মো. জুনেদ আহমদ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী দল ও রাজনৈতিক কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি হবিগঞ্জে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পরবর্তী দিনের পদযাত্রা কর্মসূচিতে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান। ফেনীতেও একই দাবিতে একটি বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে জেলা এনসিপি। ফেনী জেলা এনসিপির আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম সৈকত, সদস্য সচিব শাহ ওয়ালি উল্লাহ মানিকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ সেখানে বক্তব্য রাখেন।
হবিগঞ্জে এনসিপির সমাবেশে হামলা এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের হেনস্তা করার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ এক বিবৃতিতে বলেন, রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়ে সরকার এখন মাঠে সন্ত্রাসী শক্তিকে লেলিয়ে দিয়েছে। তিনি বিএনপির হামলাকারী নেতাকর্মীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান। বাংলাদেশ খেলাফতের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ তাঁর বিবৃতিতে স্বৈরাচারী পতনের পরিণতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান। নেজামে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী ও মহাসচিব মূসা বিন ইযহার রাজনৈতিক ভিন্নমতের জেরে এ ধরনের সহিংসতা ও সন্ত্রাসের কঠোর সমালোচনা করেন। খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, এবি পার্টি এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন সমমনোভাপন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন আলাদা বিবৃতিতে এই হামলার নিন্দা জ্ঞাপন করেছে।
চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। সিলেটের সীমান্তবর্তী পাঁচটি উপজেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি মোতায়েন করার জন্য জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছে আবেদন জানান পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক। বিশেষ করে জৈন্তাপুর, গোলাপগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ—এই পাঁচ উপজেলায় আগামী দুই দিন বিজিবি মোতায়েনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার গণমাধ্যমকে জানান, সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে এনসিপির পূর্বঘোষিত কর্মসূচি থাকায় এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে এই অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সাহায্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শান্তি ও সহনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন অনমনীয় অবস্থান এবং পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।