ছাত্রদল সভাপতিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এনসিপির মামলা দায়ের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার
ছাত্রদল সভাপতিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এনসিপির মামলা দায়ের

প্রকাশ: ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে হামলা ও পূর্বঘোষিত প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নিতে বাধা প্রদানের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার রেশ ধরে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজীব আহমেদ রিংগনসহ এগারো জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বসে এই মামলাটি দায়ের করেন জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তাহের। এই মামলায় জেলা ছাত্রদলের সভাপতি রিংগনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে, যা জেলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে এক কঠোর মেরুকরণ ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন হবিগঞ্জে এনসিপির পূর্বনির্ধারিত পদযাত্রায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে ব্যাপক হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে। ওই হামলায় দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এবং বিশিষ্ট নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুসহ একাধিক কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন। এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে এবং পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার হয়ে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু তাদের এই শান্তিপূর্ণ অভিযাত্রাকে কেন্দ্র করেই জেলাজুড়ে চরম প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের সৃষ্টি হয়।

মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করার পর শ্রীমঙ্গল এলাকায় একবার পুলিশি ব্যারিকেডের মুখোমুখি হলেও এনসিপির নেতারা সেই বাধা অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যান। তবে বাহুবল উপজেলার মুছাই এলাকায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে রশিদপুর গ্যাসফিল্ড মোড় পেরিয়ে কামাইছড়া রাবার বাগান এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ, র‍্যাব এবং গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি যৌথ ও কঠোর ব্যারিকেডের মুখে পড়ে তাদের পুরো গাড়িবহরটি আটকে যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির আশঙ্কায় এবং সংঘাত এড়ানোর অজুহাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের পথরোধ করা হয়।

পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নেয় যখন পুরাতন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আমতলী সেতু এলাকায় একটি ভারী বালুবাহী ট্রাক ও একটি যাত্রীবাহী বাস ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে পুরো সড়কটি অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। এর তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা কোনো উপায় না পেয়ে প্রকাশ্য সড়কেই অবস্থান নিয়ে বসে পড়েন। ফলে বিকেল পাঁচটা থেকে ওই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র গরম ও যাতায়াতের অভাবে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা এই অচলাবস্থা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর পুলিশ প্রশাসন ও এনসিপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দফায় দফায় দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

অবশেষে দীর্ঘ আলোচনার পর সন্ধ্যা সাতটার দিকে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এনসিপির নেতাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশ না করার বিষয়ে এক প্রকার সম্মত করান। এরপর রাত পৌনে আটটার দিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ এবং ডা. মাহমুদা মিতুকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ সুপার সরাসরি বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যান। ফাঁড়ির ভেতরে বসে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মামলার কার্যক্রম চালানো হয়। মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর রাত নয়টার দিকে ওই মহাসড়কে পুনরায় যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

মামলা দায়েরের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে এক তাৎক্ষণিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিংয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁদের দলের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলমসহ বহু নেতাকর্মীকে আহত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই হামলায় তাদের প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকার সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, আজকের রাতের মধ্যেই মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ব্রিফিং এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর পুলিশ প্রশাসনের কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা কামাইছড়া এলাকা ত্যাগ করে নিরাপদে শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে রওনা দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা এবং পাল্টাপাল্টি সংঘাতের জেরে আগামী দিনে স্থানীয় রাজনীতিতে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন একটাই আলোচনা, হবিগঞ্জের এই আকস্মিক ও ভয়াবহ সংঘাত কীভাবে এত দূর গড়াল। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং মাঠ দখলের যে অসুস্থ সংস্কৃতি চলে আসছে, তারই এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে হবিগঞ্জের এই ঘটনায়। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা যখন তাঁদের পূর্বনির্ধারিত পদযাত্রা ও প্রতিবাদ কর্মসূচি সফল করতে ঢাকার রাজপথ ছেড়ে সিলেটের আঞ্চলিক জনপদে প্রবেশ করেন, তখন থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে এক চরম অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং তাতে শীর্ষস্থানীয় নেতারা আহত হওয়ার ঘটনাটি পুরো দলকে মানসিকভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর প্রতিবাদে যখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মাঠে নেমে আসেন, তখন প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ চরমে পৌঁছায়।

বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এবং পুরাতন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যা ঘটেছিল, তা কেবল একটি সড়ক অবরোধ বা পুলিশি বাধা ছিল না; এটি ছিল দুই বিপরীতমুখী রাজনৈতিক শক্তির মুখোমুখি অবস্থানের এক প্রতীকী চিত্র। মহাসড়কের মাঝখানে আড়াআড়িভাবে বাস ও বালুবাহী ট্রাক ফেলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা যেভাবে জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন, তাতে দেশের সামগ্রিক জনজীবন ও যাতায়াত ব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থাই ফুটে ওঠে। দিনের আলো নিভে আসার পরও যখন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে অনড় ছিলেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আসন্ন রাজনৈতিক দিনগুলোতে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে। পুলিশ সুপার ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও অন্তর্নিহিত ক্ষোভ ও উত্তেজনার পারদ বিন্দুমাত্র কমেনি।

মামলার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর দেওয়া হুঁশিয়ারি এবং ৩০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির দাবি রাজনৈতিক ময়দানকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলেছে। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজীব আহমেদ রিংগনকে প্রধান আসামি করে এই মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের লড়াইয়েরও নতুন অধ্যায় শুরু হলো। এনসিপি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার না করা হলে তাদের আন্দোলন আরও কঠোর ও বিস্তৃত রূপ নেবে। অন্যদিকে, স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও বসে নেই; তারাও পাল্টা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হচ্ছে, হবিগঞ্জসহ পুরো সিলেট অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং রাজনৈতিক শান্তি বজায় রাখা প্রশাসনের জন্য আগামী দিনগুলোতে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত