ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত সাঈদ-মুগ্ধর লড়াই চলবে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত সাঈদ-মুগ্ধর লড়াই চলবে

প্রকাশ:  ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে কাঙ্ক্ষিত ইনসাফ ও ন্যায়বিচার পুরোপুরি কায়েম না হওয়া পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদ আবু সাঈদ ও মুগ্ধর কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন লড়াই ও সংগ্রাম কোনোভাবেই থামবে না বলে সরকারকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত নায়েবে আমির ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন নীতি, কার্যক্রম ও প্রশাসনের নানা অনিয়মের কঠোর সমালোচনা করে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, জনগণের দীর্ঘ লড়াই ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়কে কোনোভাবেই নস্যাৎ হতে দেওয়া হবে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন না করে রাজনৈতিক ময়দানে পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসনের যেকোনো অপচেষ্টা বা তোষণ নীতি সরকার নিজেই দেশের ভেতরে এক অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে, যা কোনো অবস্থাতেই দেশের স্বার্থের অনুকূল হতে পারে না।

গত বুধবার বিকেলে রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান উত্তর কাঙ্খিত শিক্ষা ব্যবস্থা এ আমাদের করণীয়’ শীর্ষক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী এক প্রতিবাদী সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেমিনার কক্ষজুড়ে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা এবং একটি সুস্থ, দুর্নীতিমুক্ত ও মানসম্মত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জোরালো দাবি উচ্চারিত হয়। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের নানা ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরে অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের এই সাহসী ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য মুহূর্তেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সরকারের বিভিন্ন নীতির কঠোর সমালোচনা করে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা সেমিনারে বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচিত সরকার জনগণের সুমহান ঐতিহাসিক গণভোটের প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রায় এবং পবিত্র মতামতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার এক অশুভ প্রবণতা দেখাচ্ছে। রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য যেখানে দেশের আপামর জনতা একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও যুগোপযোগী সংবিধান সংস্কারের পক্ষে নিজেদের জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছে, সেখানে সরকার অর্থবহ কোনো সংস্কার না করে কেবল দায়সারা গোছের কিছু সাধারণ সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বনামধন্য শিক্ষক সমাজ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সিভিল প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে অতীতের মতো পুনরায় দলীয় ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও নিয়োগ করা হচ্ছে, যা জনমনে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান আরও বলেন, দেশ ও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে যদি এ ধরনের অনিয়ম, বৈষম্য এবং স্বেচ্ছাচারিতার রাজত্ব এভাবে অবাধে চলতে থাকে, তবে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হবে না। জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের যে রক্ত ও আত্মত্যাগ এ দেশ দেখেছে, তার মূল লক্ষ্যই ছিল একটি ইনসাফভিত্তিক ও বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করা। সেই ঐতিহাসিক আদর্শ ও চেতনাকে পদদলিত করে যতো দিন পর্যন্ত এ দেশের আপামর মেহনতি মানুষের পূর্ণ অধিকার এবং ইনসাফ কায়েম নিশ্চিত করা না হবে, ততো দিন পর্যন্ত শহিদ আবু সাঈদ ও মুগ্ধদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত লড়াই এবং সংগ্রামের এই পবিত্র ধারা কোনোভাবেই স্তব্ধ বা বন্ধ হবে না। দেশের ছাত্রসমাজ ও তরুণ প্রজন্ম তাদের সেই অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন।

সেমিনার চলাকালীন বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে দেশের শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার চিত্র তুলে ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয় দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি জানিয়ে বলা হয় যে, স্থানীয় সরকার বা অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণ করার বৈধ অধিকার ও সুযোগ আগের মতো নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। পাশাপাশি, দেশের শিক্ষক সমাজকে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে তাদের অতি দ্রুত সরকারি নতুন নবম পে স্কেলের আওতাভুক্ত করতে হবে এবং দেশের সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরি অবিলম্বে সম্পূর্ণ জাতীয়করণ করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়। দেশের মেধাবী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক সমাজের এই ন্যায্য দাবিগুলো অবিলম্বে মেনে না নিলে শিক্ষক সমাজ বৃহত্তর ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে বলে সেমিনার থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।

দেশের আপামর মেহনতি মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যখন নানামুখী সংকটে আবর্তিত, ঠিক সেই মুহূর্তে অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের এই কঠোর হুঁশিয়ারি দেশের রাজনীতিতে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী বার্তা নিয়ে এসেছে। একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং পূর্ণাঙ্গ ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন বুকে ধারণ করে আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ হাজারো তরুণ রাজপথে নিজেদের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই মূল আদর্শ থেকে সরকার আজ বিচ্যুত হচ্ছে কি না—তা নিয়ে এখন চারদিকে তীব্র প্রশ্ন ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা এবং বর্তমান প্রশাসনের বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সেটিকে অত্যন্ত নিখুঁত ও সাহসিকতার সঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবের এই মঞ্চ থেকে তুলে ধরেছেন জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা। তাঁর এই বক্তব্যে কেবল সরকারের ভুলত্রুটির সমালোচনাফই ফুফুটে ওঠেনি, বরং দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক পথচলা এবং শাসনব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন নিয়ে এক গভীর চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে।

বিশেষ করে, গণভোটের প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষের সুমহান রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা সরকার দেখাচ্ছে, তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু প্রথাগত বা দায়সারা সংশোধনীর মাধ্যমে বদলে ফেলা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন জনগণের সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট এবং কাঠামোগত আমূল সংস্কার। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই মৌলিক সংস্কারের পথ মাড়িয়ে কেবল গতানুগতিক ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করছে এবং শিক্ষক সমাজ থেকে শুরু করে মাঠপ্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুনরায় দলীয়করণের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। অতীতেও আমরা দেখেছি কীভাবে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণের কারণে জনসেবা বিঘ্নিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রে বৈষম্যের পাহাড় জমেছে। বর্তমান সরকার যদি সেই পুরোনো পথেই হাঁটতে শুরু করে, তবে জনগণের মনে যে ক্ষোভের আগুন এতদিন চাপা ছিল, তা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত রূপ ধারণ করতে পারে।

তাছাড়া, শিক্ষকদের মতো জাতির মেরুদণ্ড গড়ার কারিগরদের দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সরকারের উদাসীনতা দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে যে নয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, তা কেবল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার দাবি নয়; এটি এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি মানসম্মত, দুর্নীতিমুক্ত ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন উপহার দেওয়ার মোক্ষম হাতিয়ার। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করা, নবম পে স্কেলের আওতায় তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং স্থানীয় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বারবার স্মারকলিপি ও আন্দোলন সত্ত্বেও নীতিনির্ধারক মহল এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, শহিদদের রক্তে ভেজা এই বাংলায় কোনো ধরনের অনিয়ম, বৈষম্য বা ফ্যাসিবাদী আচরণ আর বরদাশত করা হবে না। ইনসাফ বা সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে রাষ্ট্র কখনো এগোতে পারে না। পরাজিত শক্তিকে তোষণ করে কিংবা জনগণের ম্যান্ডেটকে পদদলিত করে সাময়িক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশকে এক ভয়াবহ সংকটের দিকে নিয়ে যাবে। দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষক সমাজ এবং সাধারণ জনগণ আজও সেই জুলাইয়ের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে রাজপথে চোখ মেলে আছে। সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং তারা জনগণের প্রকৃত চাওয়াকে সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে দেশের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করবে—এটাই আজ দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রাণের দাবি। অন্যথায়, সাঈদ ও মুগ্ধদের রেখে যাওয়া এই পবিত্র লড়াই আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে সরকারের সব অনিয়ম ও বৈষম্যকে চিরতরে উৎখাত করবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দেশের সচেতন রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত