বাস ডিপো সরেও মহাখালীর যানজট কমেনি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৮ বার
বাস ডিপো সরেও মহাখালীর যানজট কমেনি

প্রকাশ: ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা মহাখালী বাস টার্মিনালের চিরচেনা তীব্র যানজট নিরসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে পূর্বাচলে একটি অস্থায়ী বাস ডিপো চালু করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। গত ১৬ জুলাই অত্যন্ত ঘটা করে এবং নানা আশাবাদের মধ্য দিয়ে এই অস্থায়ী বাস ডিপোটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। মূল পরিকল্পনা ছিল, দূরপাল্লার বাসগুলো নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা বা তারও আগে পূর্বাচলের এই নির্ধারিত খোলা স্থানে অবস্থান করবে এবং পরবর্তীতে সুশৃঙ্খলভাবে সিরিয়াল অনুযায়ী মহাখালী টার্মিনালে প্রবেশ করে যাত্রীবোঝাই করে গন্তব্যে রওনা হবে। এর ফলে মহাখালী টার্মিনাল ও আশপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে অপ্রয়োজনীয় বাসের দীর্ঘ জটলা ও যত্রতত্র পার্কিং কমে আসবে এবং রাজধানীজুড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অনেকটাই স্বাভাবিক হবে। তবে উদ্বোধনের প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও অধিকাংশ পরিবহন মালিক ও চালকরা এই ডিপোটি ব্যবহারে চরম অনীহা প্রকাশ করছেন, যার ফলে মহাখালী এলাকায় সড়কের ওপর অবৈধ ও বিশৃঙ্খল বাস পার্কিংয়ের পুরোনো দৃশ্যপট এখনো পুরোপুরি বহাল রয়েছে।

সরেজমিনে পূর্বাচলের ৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই অস্থায়ী বাস ডিপো এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই ডিপো প্রাঙ্গণে নামমাত্র মাত্র বিশটির মতো বাস অলসভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ এই সুপরিসর স্থানে অনায়াসে শতাধিক বাস রাখার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত সুযোগ রয়েছে। বিলাশ, আহনাল, ইকবাল, সাভার, দিশারী, গ্রিন বাংলা, হাজী ট্রাভেল, পিংকি ও হানিফ পরিবহনের হাতে গোনা কিছু বাস বর্তমানে সেখানে স্থানান্তরিত হলেও অন্য অধিকাংশ পরিবহন এখনো আগের মতো মহাখালী ও সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের মতো করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সচেতন মহলের মতে, কেবল খাতা-কলমে বা ফিতাকেটে কোনো ডিপো উদ্বোধন করলেই তার সুফল পাওয়া সম্ভব নয়; এর জন্য প্রতিটি পরিবহন কোম্পানি ও চালকদের এই ব্যবস্থার কঠোর আওতায় আনা আবশ্যক। তা না হলে যে মহান উদ্দেশ্যে মহাখালীর যানজট কমানোর এই বিশাল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

ডিপো ব্যবহার না করার কারণ হিসেবে পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের বাস্তবসম্মত ও মৌলিক সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। কুড়িগ্রাম রুটের পিংকি পরিবহনের চালক আলমগীর গণমাধ্যমকে জানান যে, দূরবর্তী জেলার কিছু নির্দিষ্ট বাস বর্তমানে বাধ্য হয়ে পূর্বাচলে রাখা হচ্ছে, তবে সব রুটের বাস বা সব পরিবহন এই নির্দেশ মানছে না। অনেক বাস তাদের নির্দিষ্ট ট্রিপ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই অন্যত্র চলে যায়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, গত চার দিন ধরে ডিপোতে অবস্থান করেও চালক ও শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম কোনো খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের প্রতিদিন সীমাহীন শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আহনাল পরিবহনের সুপারভাইজার বাবু জানান যে, মহাখালী টার্মিনালে নির্দিষ্ট সমিতিভুক্ত নয় এমন বাস পার্কিং করলে অতিরিক্ত অর্থদণ্ড বা চাঁদা গুনতে হয়, কেবল সেই আর্থিক ঝুঁকির হাত থেকে বাঁচতেই কিছু পরিবহন অনিচ্ছাসত্ত্বেও পূর্বাচলের এই ডিপো ব্যবহার শুরু করেছে।

চালক ও শ্রমিকদের প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে এই অস্থায়ী ডিপোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং উন্নত অবকাঠামোর চরম অভাব। রান্নাবান্না বা খাওয়ার জন্য ডিপোর কাছাকাছি কোনো ভালো রেস্তোরাঁ বা খাবারের হোটেল না থাকায় চালক-শ্রমিকদের কয়েক কিলোমিটার দূরে হেঁটে বা যানবাহনে যাতায়াত করতে হয়। পাশাপাশি, সেখানে মানসম্মত টয়লেট বা শৌচাগারেরও দারুণ সংকট রয়েছে। যদিও ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে মানবিক দিক বিবেচনা করে চালক ও শ্রমিকদের বিশ্রামের জন্য অস্থায়ী তাঁবু, খাট, বিছানা এবং ফ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের উদ্যোগে বিশুদ্ধ সুপেয় পানির সুব্যবস্থাও করা হয়েছে, তবুও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে, মাঠের মেঝে এখনো সম্পূর্ণ কাঁচা থাকায় বাতাসের সঙ্গে উড়ে আসা বালুর কারণে চলাচলে এবং জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া, প্রখর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে অস্থায়ী তাঁবুগুলোর ভেতরে তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তীব্র গরমে শ্রমিকদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।

ডিপো পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির আশ্বাস দিয়েছেন। ট্রাফিক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান যে, প্রতিদিন ধীরে ধীরে হলেও ডিপোতে বাস প্রবেশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চালকদের খাবার সংকট দূর করতে খুব দ্রুতই দুটি নতুন রেস্তোরাঁ চালুর জোর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি, মূল সড়ক থেকে ডিপোতে যাতায়াতের প্রবেশপথের বড় বড় গর্তগুলো ভরাটের কাজও সমানতালে এগিয়ে চলছে। রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসারের সহকারী কমান্ডার মো. রুবেল হোসেন জানিয়েছেন যে, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পালাক্রমে রাজউকের পনেরো জন আনসার সদস্য, ট্রাফিক বিভাগের তিনজন এবং পুলিশ লাইনের আঠারো জন সদস্য অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। রাজউকের পক্ষ থেকে মাঠ উন্নয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত কনভয় সার্ভিসের প্রকৌশলী সুদীপ্ত সরকার জানান যে, বর্তমানে প্রায় দেড় শ ফুট বাই ছয় ফুট এলাকা বাস রাখার উপযোগী করে তোলার কাজ চলছে এবং আগামী দশ থেকে পনেরো দিনের মধ্যে এই সংস্কার কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হবে। প্রায় দশ একর সুবিশাল জায়গাজুড়ে একটি স্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে পরবর্তীতে আধুনিক শেড, আরামদায়ক ওয়েটিং রুম, ক্যান্টিন, আধুনিক ওয়াশরুম, নামাজের স্থান এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক বাস ডিপো গড়ে তোলা হবে।

তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কিছু প্রশাসনিক জটিলতাও দৃশ্যমান হয়েছে। রাজউকের উচ্ছেদ অভিযান এবং বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সুসমন্বিত উদ্যোগের অভাবে সার্বিক উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ কিছুটা শ্লথ গতিতে এগোচ্ছে। ফলে অবকাঠামোগত এই সমস্ত দৃশ্যমান সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতিগুলো যত দ্রুত সম্ভব দূর করা না গেলে অধিকাংশ পরিবহন সংস্থাকে স্বেচ্ছায় বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই ডিপো ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ঢাকা জেলা বাস-মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সহসভাপতি ইউসুফ মির্জা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন যে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং অতিবৃষ্টি না হলে আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যেই এই ডিপোটি পুরোপুরি যানবাহন পার্কিং ও পরিচালনার উপযোগী হয়ে উঠবে। সেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেখানে আরও অধিক সংখ্যক বাস স্থানান্তরিত হবে এবং আগস্ট মাসের মধ্যেই সুনির্দিষ্ট ক্যান্টিন, গ্যারেজসহ প্রয়োজনীয় সকল নাগরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা চালু করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, পূর্বাচলের এই অস্থায়ী বাস ডিপোটি তার পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করলে এবং প্রশাসনিক তদারকি কঠোর হলে তবেই দীর্ঘদিনের যানজটে নাকাল মহাখালী এলাকার লাখ লাখ মানুষ সত্যিকার অর্থে মুক্তি পাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com