প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পূর্বঘোষিত প্রতিবাদী সমাবেশ ও ধারাবাহিক পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সিলেটের স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে একধরনের টান টান উত্তেজনা ও চাপা উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা, যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা এড়ানো এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সিলেটের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় মোট পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ক্রাইম অ্যান্ড অপস বিভাগের কর্মকর্তা জাকির হোসাইন গণমাধ্যমের কাছে এই বিজিবি মোতায়েনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশাসনের এই কঠোর ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপের ফলে পুরো জেলাজুড়ে এখন ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এনসিপির পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায় কানাইঘাট উপজেলায় এবং সন্ধ্যা সাতটায় ওসমানীনগর উপজেলায় তাদের সুনির্ধারিত পদযাত্রা ও জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর পরের দিন অর্থাৎ শুক্রবার বিকেল তিনটায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়, বিকেল পাঁচটায় গোয়াইনঘাট উপজেলায় এবং সন্ধ্যা সাতটায় জৈন্তাপুর উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে পদযাত্রা শেষে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সিলেটের এই সীমান্তবর্তী ও সংবেদনশীল উপজেলাগুলোতে এনসিপির এই ঠাসা কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় প্রশাসন বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিতে নারাজ। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এই পাঁচ উপজেলায় বিজিবি মোতায়েন করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানানো হয়েছিল।
এর আগে গত বুধবার সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিশ্চিত করেছিলেন যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের চিঠির প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার—এই দুই দিনের জন্য সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তার স্বার্থেই বিজিবি চাওয়া হয়েছে। সিলেটের সহকারী পুলিশ সুপার ও মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সম্রাট তালুকদার আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেন যে, এনসিপির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা সিলেটের এই পাঁচটি ভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তাঁদের জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করবেন। এই কর্মসূচিগুলোতে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নাশকতা না ঘটে, সেটির স্বার্থেই পোশাকে ও সাদা পোশাকে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ভৌগোলিক স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুদৃঢ় রাখতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েনের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে তিনি মনে করেন।
কয়েকটি স্থানে কর্মসূচির সময়সূচি সূর্যাস্তের পর বা সন্ধ্যার দিকে হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি কিছুটা বেশি বলে মনে করছে প্রশাসন। এ বিষয়ে এনসিপি সিলেট মহানগরের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান আফজল সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তাদের পূর্বনির্ধারিত এই জেলাব্যাপী জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার সকালে জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয় শহীদ পরিবারগুলোর সদস্যদের নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাঁদের এই সমস্ত কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই আয়োজন করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার ফলে নেতাকর্মীদের মাঝে কিছুটা কড়াকড়ি অনুভূত হলেও সার্বিক কার্যক্রমে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে তারা আশাবাদী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং অনমনীয় অবস্থানের কারণে যেসব অনভিপ্রেত সংঘাতের ঘটনা ঘটে চলেছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সিলেট জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবার সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে সিলেটের মতো সীমান্তবর্তী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে বিজিবি মোতায়েন করার ফলে যেকোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলা বা সন্ত্রাসী তৎপরতা কঠোরহস্তে দমন করা সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আশা প্রকাশ করেছেন যে, প্রশাসনের এই কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার কারণে দলগুলো তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পারবে এবং জনজীবনে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটবে না। সব মিলিয়ে, এনসিপির এই দুই দিনের পদযাত্রা ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুরো সিলেট অঞ্চলে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সিলেটের এই সীমান্তবর্তী ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোতে বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্তটি কেবল তাৎক্ষণিক কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি বা শোডাউনকে কেন্দ্র করে দেশের নানা প্রান্তে যে ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসন এবার বিন্দুমাত্র শৈথিল্য দেখাতে রাজি নয়। বিশেষ করে সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন রুট দিয়ে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা নাশকতা রোধ করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো শুরু থেকেই অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে ছিল। এনসিপির এই ধারাবাহিক পদযাত্রা ও জনসমাবেশগুলো যখন একে একে কানাইঘাট, ওসমানীনগর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট এবং জৈন্তাপুরের মতো জনবহুল ও দূরবর্তী উপজেলাগুলোতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন প্রতিটি স্পটে পর্যাপ্ত পুলিশ ও সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা কর্মীদের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যদের উপস্থিতি পুরো এলাকার নিরাপত্তা বলয়কে এক দুর্ভেদ্য চাদরে ঢেকে দিয়েছে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মাঝে এই ব্যাপক নিরাপত্তা আয়োজন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও মূলত স্বস্তিই বেশি বিরাজ করছে। অতীতে রাজনৈতিক উত্তাপের কারণে যখনই কোনো বড় ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে, তখনই সাধারণ পথচারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করত যে কখন না জানি দোকানপাট বন্ধ করতে হয় কিংবা যানবাহনে ভাঙচুর চালানো হয়। কিন্তু এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে থেকেই কঠোর হুঁশিয়ারি এবং বিজিবির মতো আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার ফলে সম্ভাব্য হামলাকারী বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা যেকোনো ধরনের অঘটন ঘটানোর আগে বহুবার চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে। এনসিপির স্থানীয় নেতারাও বারবার দাবি করে আসছেন যে তাঁদের আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম; কিন্তু তা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে অতিরিক্ত উত্তেজনা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সম্ভাব্য উসকানি এড়ানোর জন্য এই যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
তাছাড়া, বিশেষ করে যেসব কর্মসূচি সূর্যাস্তের পর বা সন্ধ্যার সময়গুলোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, সেই সময়গুলোতে নিরাপত্তাঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। রাতের অন্ধকারে যাতে কোনো দুষ্কৃতকারী বা স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য বিজিবির টহল দলগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অবস্থান করছে। জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আইনের মার্যাদা লঙ্ঘন করে কেউ যদি জনজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করার বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ন্যূনতম চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে সর্বোচ্চ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরিশেষে, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই সিলেটের এই দুই দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হবে এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও যাতায়াত পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ থাকবে বলেই দেশবাসীর প্রত্যাশা।