দাদনের ফাঁদে জেলেরা, সীতাকুণ্ডে সাধারণের নাগালের বাইরে ইলিশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
দাদনের ফাঁদে জেলেরা, সীতাকুণ্ডে সাধারণের নাগালের বাইরে ইলিশ

প্রকাশ: ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবন বাজি রেখে জেলেরা যখন গভীর সমুদ্র থেকে রুপালি ইলিশ শিকার করে কূলের কাছাকাছি ফিরে আসেন, তখন সেই উপকূলীয় জনপদের সাধারণ মানুষের মুখে আনন্দের পরিবর্তে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়ে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ডোংখালী বগাচতর, বাঁকখালী, বসতনগর, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, বাড়বকুণ্ড, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারী ও সলিমপুরসহ সুদীর্ঘ উপকূলজুড়ে প্রায় ১৯টি মাছঘাটে প্রতিদিন শত শত ইলিশভর্তি ট্রলার ভিড় জমাতে দেখা যায়। প্রতিটি মাছঘাটেই এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাছ খালাস করা, বরফজাতকরণ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ট্রাকগুলোতে মাছ তোলার চরম ব্যস্ততা লেগেই থাকে। অথচ এত বিশাল পরিমাণের ইলিশের সমাগম ঘটার পরেও উপকূলীয় এলাকার সাধারণ ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের ভাগ্যে তা জোটে না বললেই চলে। আড়তগুলো থেকে মাছ ঘাটে নামার সঙ্গে সঙ্গেই পাইকাররা ট্রাকভর্তি করে সেই ইলিশ ঢাকা, যশোর, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় জেলা শহরে পাঠিয়ে দেন, যার ফলে স্থানীয় বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায় প্রিয় এই মাছটি।

স্থানীয় মৎস্যজীবী ও সচেতন ব্যবসায়ীদের জোরালো অভিযোগ অনুযায়ী, সীতাকুণ্ডের এই মাছ ব্যবসা এবং পুরো বাজার ব্যবস্থরিটি সম্পূর্ণভাবে একটি অসাধু চক্র ও দাদননির্ভর সিন্ডিকেটের কব্জায় চলে গেছে। সীতাকুণ্ড পৌরসভার উত্তর বাজারের প্রধান মাছের আড়তকে কেন্দ্র করেই মূলত এই রমরমা পাইকারি ব্যবসা পরিচালিত হয়, যার পুরো নিয়ন্ত্রণই এখন বহিরাগত পাইকার বা বেহারি ব্যবসায়ীদের হাতের মুঠোয় বন্দি। এই বহিরাগত ব্যবসায়ীরা তাদের বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের জোরে একযোগে ঘাটের সমস্ত ভালো ইলিশ কিনে দেশের দূর-দূরান্তে পাচার করে দেন। স্থানীয় বাজারে মাছের সরবরাহ একেবারে ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি মণ ইলিশ অবিশ্বাস্য চড়া দামে অর্থাৎ ১৬ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে, যেখানে সাধারণ ক্রেতাদের এক কেজি ইলিশ কিনতে হলে দুই হাজার থেকে শুরু করে দুই হাজার সাতশ টাকা পর্যন্ত গুণতে হচ্ছে। উপকূলে বসবাস করেও উপকূলের সাধারণ মানুষ আজ ইলিশের মতো সুস্বাদু মাছের দেখা না পাওয়ায় এটি তাদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই একটি বিলাসী খাদ্যে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার চারশ আঠারোজন জেলে জীবিকা নির্বাহের জন্য সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যক জেলের নিজস্ব কোনো অর্থনৈতিক পুঁজি বা সঞ্চয় না থাকায় তারা এক ভয়াবহ ফাঁদে আটকা পড়েছেন। সমুদ্রগামী ট্রলারের জ্বালানি তেল কেনা, বরফ সংগ্রহ করা, জালের ক্ষতি মেরামত করা এবং সাগরে যাওয়ার সময় জেলের পরিবারের খোরাকি বা খাদ্য ব্যয়ের জন্য মৌসুমের শুরুতেই তারা বাধ্য হন স্থানীয় আড়তদার ও প্রভাবশালী মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে বা শর্তে দাদন বা ঋণ নিতে। এই দাদনের নির্মম ও কঠোর শর্তের কারণে জেলেরা সাগরে যা মাছই শিকার করুক না কেন, তা বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট সেই মহাজন বা আড়তেই কম দামে বিক্রি করতে হয়। বাজারে ইলিশের দাম যতই আকাশচুম্বী হোক না কেন, তার আর্থিক সুফল বা লাভজনক দামের বিন্দুমাত্র অংশও সেই খেটে খাওয়া জেলেদের হাতে পৌঁছায় না। লাভের পুরো অংশটি মধ্যস্বত্বভোগী, আড়তদার ও দাদনদাতাদের পকেটে চলে যায়, আর বছরের পর বছর ধরে ঋণের এই নিষ্ঠুর চক্রে পিষ্ট হয়ে জেলেরা নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হতে থাকেন।

সোনাইছড়ি উপকূলের দুঃখী জেলে অনু জলদাস অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে গণমাধ্যমের কাছে নিজের দুর্দশার কথা ব্যক্ত করে জানান যে, তাঁরা প্রতিদিন জীবনের মারাত্মক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে উত্তাল সাগরে মাছ ধরতে যান, কিন্তু দাদনের ঋণের জালে বন্দि থাকায় তাঁরা নিজেদের ইচ্ছামতো খোলা বাজারে মাছ বিক্রি করার সামান্য স্বাধীনতাটুকুও পান না। সব মাছের হিসাব শেষে যখন মহাজনের খাতা মেলানো হয়, তখন দেখা যায় সমস্ত লাভের অংশ মহাজনের পকেটে চলে গেছে এবং তাঁরা কেবল দিনভর হাড়ভাঙা শ্রমই দিয়ে গেছেন। কুমিরা ইউনিয়নের স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দা কানু নাথ হতাশা প্রকাশ করে বলেন যে, তাঁদের ঘরের পাশেই উত্তাল সাগর এবং সেখান থেকে প্রতিদিন ট্রলারভর্তি ইলিশ উঠছে, অথচ তাঁরা নিজেদের পরিবারের ছোট শিশুদের একটু ইলিশের স্বাদ দিতে পারছেন না। দুই হাজার টাকার ওপরে প্রতি কেজি মাছ কিনে খাওয়া তাঁদের মতো সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাধারণ ক্রেতা জাহিদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, বহিরাগত পাইকারদের বিশাল পুঁজির সঙ্গে সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না, কারণ ভালো মানের সমস্ত ইলিশ আড়ত থেকেই বাইরে পাচার হয়ে যায়। স্থানীয় এক হোটেলের মালিক সোহেল জানান যে, আড়তে এক মণ ইলিশের দাম যদি এক লাখ সাত হাজার টাকা হয়, তবে সেই চড়া দামে ইলিশ কিনে রেস্তোরাঁ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী হাসেম ডিলার একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিয়ে বলেন যে, সপ্তাহের অন্তত একদিন বাইরের জেলাগুলোতে ইলিশ পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে যদি স্থানীয় বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়, তবেই কেবল সাধারণ মানুষ কিছুটা নায্য দামে প্রিয় এই মাছ কিনতে পারবে।

এদিকে সাধারণ জেলে ও ব্যবসায়ীদের শোষণ করার পাশাপাশি আরেকটি গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। কুমিরা ইউনিয়নের আরেক বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, একটি সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী চক্র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে এবং তাঁর নাম ব্যবহার করে এই অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার মাছ ধরার নৌকা থেকে প্রতি নৌকার বিপরীতে দুই হাজার টাকা করে জোরপূর্বক অবৈধ চাঁদা আদায় করছে। এই অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোতাসিম বিল্লাহর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান যে, এ ধরনের অনৈতিক চাঁদাবাজির কথা তিনিও বিভিন্ন সূত্রে শুনেছেন। কারা তাঁর নাম ভাঙিয়ে নিরীহ জেলেদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে বের করা অত্যন্ত জরুরি এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তিনি আরও জানান যে, প্রতি বছর জুলাই মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়টিকে ইলিশ আহরণের প্রধান মৌসুম হিসেবে ধরা হয় এবং পরবর্তীতে অক্টোবর মাসে মা-ইলিশ প্রজনন সুরক্ষার জন্য সরকার কঠোরভাবে ২২ দিন সব ধরনের ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সেই নিষিদ্ধ সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের সরকারিভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে।

সার্বিক এই পরিস্থিতি নিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন যে, বাজারে ইলিশের অতিরিক্ত ও লাগামহীন দামের কারণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ আজ এই মাছ কেনার কথা চিন্তাও করতে পারছে না। স্থানীয় সাধারণ মানুষের নায্য স্বার্থ রক্ষা করার জন্য তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব দিয়েছেন যে, সপ্তাহের অন্তত নির্দিষ্ট কিছু দিন বাইরের জেলাগুলোতে ইলিশ সরবরাহ বন্ধ রেখে স্থানীয় সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সরাসরি মাছ বিক্রির বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। দাদনের অভিশাপ থেকে সীতাকুণ্ডের পাঁচ হাজারের বেশি জেলেকে মুক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ইলিশের বাজারমূল্য নামিয়ে আনতে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে উপকূলের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ আরও চরম আকার ধারণ করবে বলে সচেতন মহল মনে করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত