জুলাই আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে রুমিনের তীব্র সমালোচনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
জুলাই আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে রুমিনের তীব্র সমালোচনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই অভ্যুত্থান এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশো ও সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, জুলাই আন্দোলনের সময় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে গর্তে, ডোবায় ও খালে লুকিয়ে ছিলেন। এমনকি আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে তারা এই গণআন্দোলন থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন এবং হাত ধুয়ে ফেলার মতো অবস্থান নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার এই বক্তব্য প্রকাশের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া ও আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে ছিলেন, তাদের ভূমিকা নিয়ে এই ধরনের মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সাক্ষাৎকারে রুমিন ফারহানা নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ত্যাগের কথা তুলে ধরে বলেন, তৎকালীন আন্দোলন চলাকালে তার নিজের ওপরও নানা ধরনের নিপীড়ন ও হামলা চালানো হয়েছিল। তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তার নিজ বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং তার ব্যবহৃত গাড়িও ভেঙে ফেলা হয়েছে। তৎকালীন সময়ের গণমাধ্যমের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ঘটনার রাতেও বিভিন্ন চ্যানেলের সাংবাদিকরা তার ভাঙচুর হওয়া বাড়িতে উপস্থিত হয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সেই সময় তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুক লাইভ করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং তার ওপর চলা তাণ্ডবের চিত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। নিজের এই সক্রিয় উপস্থিতি এবং ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, বর্তমানে যারা বড় বড় কথা বলছেন বা নিজেদের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দাবি করছেন, তাদের কতজনকে রাজপথে বা জনগণের পাশে দেখা গিয়েছিল।

সংসদের কার্যপ্রণালী এবং অতীতের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই সংসদ সদস্য জানান, জাতীয় সংসদে চাইলেই যখন-তখন যেকোনো বিষয়ে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয় না। সংসদীয় বিধি অনুযায়ী কথা বলার জন্য আগে থেকেই হুইপের নিকট থেকে সময় বরাদ্দ বা অ্যালোকোশন নিতে হয়। তা সত্ত্বেও তিনি অতীতে সংসদে বিভিন্ন সময় জনগণের পক্ষে এবং জুলাই আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে দাবি করেন। তিনি বর্তমান সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে বলেন, জুলাই আন্দোলনের কঠিন দিনগুলোতে রাজপথে কাদের মুখ দেখা গিয়েছিল বা কাদের বাড়িঘর ও সম্পদ আক্রান্ত হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের মনে রাখা উচিত। জনগণের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্বার্থে অনেক সময় মানুষ সুবিধাজনকভাবে সবকিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল ও বর্তমান ক্রেডিট নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় বিএনপির নেতারা নিজেদের আড়াল করে রেখেছিলেন। তারা তখন গর্তে, ডোবায় ও খালে লুকিয়ে ছিলেন এবং প্রথম দিকে এই আন্দোলনের দায় নিতে নারাজ ছিলেন। তারা এমন ভাব প্রকাশ করেছিলেন যেন এই গণআন্দোলন তাদের দলীয় কোনো কর্মসূচি বা সংগ্রামের অংশ নয়। তবে আন্দোলনের তীব্রতা ও গণজোয়ার দেখে পরবর্তীতে তারা কিছুটা নৈতিক সমর্থন জানাতে বাধ্য হয়েছিল বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তার মতে, আন্দোলনের মূল সময়ে যথাযথ ভূমিকা পালন না করলেও বর্তমানে এই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিজেদের নামে দাবি করার জন্য এক ধরনের অসুস্থ কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য জানান, দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে দলের জন্য যারা প্রকৃত অর্থে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, বিএনপি তাদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন দিতে পেরেছে কি না, তা দলটির ভেতরের ত্যাগী নেতাকর্মী এবং নেতারা বলতে পারবেন। যেহেতু তিনি নিজে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, তাই অন্য একটি দলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ত্যাগী ও রাজপথের কর্মীদের মূল্যায়ন করা না হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রুমিন ফারহানার এই ধরনের মন্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শক্তি এই আন্দোলনের মালিকানা বা কৃতিত্ব দাবি করার দৌড়ে লিপ্ত রয়েছে। কে কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং কার ভূমিকা ঠিক কেমন ছিল, তা নিয়ে জনমনেও নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল রয়েছে। স্বতন্ত্র কোনো সংসদ সদস্যের মুখ থেকে এ ধরনের কঠোর মূল্যায়ন আসার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তর্ক-বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত বিএনপির ভূমিকা নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময়ে এই বক্তব্য রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।

জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সকল রাজনৈতিক দলের আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অতীতে কে কোথায় ছিলেন বা কার ভূমিকা কেমন ছিল, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে এখন জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। তবে রুমিন ফারহানার এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে এই ধরনের বক্তব্য আরও কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত