প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন গতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্য নিয়ে তিন দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন এই বিশেষ দূত দুপুর নাগাদ রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এবং ঢাকার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নীতি নির্ধারকদের কোনো উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির এই প্রথম ঢাকা সফর দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে উভয় দেশের নীতিনির্ধারকরা প্রত্যাশা করছেন।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, তিন দিনের এই দীর্ঘ সফরে সার্জিও গরের ব্যস্ত সময় কাটবে রাজধানী ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে। সফরের প্রথম দিনেই তিনি বাংলাদেশের সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হবেন। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে যে, আজ ঢাকায় পৌঁছানোর পর তিনি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যৌথ কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তাছাড়া, ওয়াশিংটনের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন ও নির্বাচিত সরকারের পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণেও এই বৈঠকগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
মার্কিন বিশেষদূতের এই সফরের অন্যতম প্রধান এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্র নীতির অগ্রাধিকার এবং কর্মপন্থা সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের কাছে একটি পরিষ্কার ও বাস্তবসম্মত ধারণা লাভ করা। অতীতে দুই দেশের সম্পর্কে নানা ধরনের টানাপোড়েন বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও বর্তমান সরকারের আমলে সেই বরফ গলতে শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি দেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ওবায়েদ ইসলাম অত্যন্ত ইতিবাচক মন্তব্য করে জানিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সবসময়ই অত্যন্ত আন্তরিক ও সহযোগিতাপূর্ণ ছিল এবং বর্তমান সরকারের গতিশীল নেতৃত্বে সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক বর্তমানে আরও বেশি সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটনও যে ঢাকার সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সমতার ভিত্তিতে কাজ করতে আগ্রহী, সার্জিও গরের এই সফর তারই একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বৈঠক ও আলোচনা শেষ করে সফরের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ আগামীকাল শুক্রবার মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর সরাসরি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। সেখানে তিনি সরজমিনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করবেন এবং আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান মানবেতর জীবনযাত্রা ও সার্বিক পরিস্থিতি সচক্ষে অবলোকন করবেন। দীর্ঘকাল ধরে চলা এই প্রলম্বিত রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং আন্তর্জাতিক মহলের অব্যাহত মানবিক ও আর্থিক সহায়তার বিষয়গুলো নিয়ে তিনি মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক সমাধানে বাংলাদেশের পাশে রয়েছে এবং এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উত্তরণে ওয়াশিংটন তাদের জোরালো কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সার্জিও গর। এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূতের অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও বেশি ত্বরান্বিত করেছেন। ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ, নেপালসহ এই দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের সঙ্গে মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল সফর হিসেবে নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেছেন এবং সেখানকার শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করেই তিনি শ্রীলঙ্কা ও নেপালের ধারাবাহিকতায় এবার ঢাকা সফরে এলেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সার্জিও গরের এই সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সফর কেবল বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক বোঝাপড়াকেই পোক্ত করবে না, বরং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও একটি নতুন ও সুদূরপ্রসারী মাত্রা যোগ করবে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সফরে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তিন দিনের সফর শেষ করে মার্কিন বিশেষ দূত আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ককে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা তৈরি করেন, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে পুরো দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের।