দাবানলের আগুনে বিপর্যস্ত ইউরোপ, প্রাণ গেল ৩ জনের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
দাবানলের আগুনে বিপর্যস্ত ইউরোপ, প্রাণ গেল ৩ জনের

প্রকাশ: ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রকৃতির অবিরাম রোষানল এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার চরম প্রভাবে সৃষ্ট ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে গোটা ইউরোপ মহাদেশ। বিশেষ করে ইউরোপের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা এবং প্রলয়ঙ্করী বাতাসের সংমিশ্রণে দাবানল এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক পরিণতির শিকার হয়ে গ্রিস, স্পেন ও ফ্রান্সে পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর মধ্যেই গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ এবং মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় বীরের মতো লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিন জন গ্রিক দমকলকর্মী। মানুষের প্রাণ ও সম্পদ রক্ষায় নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করতে গিয়ে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো ইউরোপজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। লাখ লাখ মানুষকে তাদের বসতি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য করা এই সর্বগ্রাসী দাবানল ইউরোপের সামগ্রিক জনজীবনকে স্থবির করে দিয়েছে।

গ্রিসের দমকল বিভাগের একজন দায়িত্বশীল মুখপাত্র আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, দেশটির বিখ্যাত পর্যটন দ্বীপ ক্রিটের ক্রিয়া ভ্রিসি গ্রামের কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আগুনের লেলিহান শিখার দুটি বিশাল অংশের ঠিক মাঝখান দিয়ে নিজেদের গাড়ি চালিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় মারাত্মকভাবে আগুনে আটকা পড়েন দুই সাহসী দমকলকর্মী। প্রবল বাতাসের গতিবেগের কারণে আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে তাদের রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় পেলোপনেস অঞ্চলে সম্পূর্ণ আলাদা আরেকটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় আরও এক দমকলকর্মী নিহত হন। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কের সঙ্গে রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, প্রলয়ঙ্করী বাতাসের কারণে জনপ্রিয় অবকাশযাপন কেন্দ্রগুলোর খুব কাছেই আগুন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলশ্রুতিতে, ক্রিয়া ভ্রিসি এবং তার আশপাশের আরও বেশ কয়েকটি জনবহুল গ্রাম ও পর্যটনকেন্দ্র থেকে সাধারণ বাসিন্দা ও বিদেশি পর্যটকদের জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় স্থানীয় প্রশাসন।

গ্রিসের পর্যটন এলাকাগুলোর স্থানীয় বাসিন্দারা এই আকস্মিক ও ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে চরম আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ক্রিসা জিউকাকি সংবাদমাধ্যমকে বলেন যে বাতাসের তীব্রতা এতটাই ভয়ংকর ও প্রখর ছিল যে অনেক সময় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। আগুনের বিশাল শিখা চারদিক গ্রাস করে ফেলেছিল এবং সেই দৃশ্য অত্যন্ত ভীতিকর ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে উপকূলীয় শহর আগিয়া গালিনির দিকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। ছোট একটি বন্দরের ওপরে পাহাড়ের ঢালজুড়ে অবস্থিত অনেকগুলো হোটেল ও রিসোর্ট তখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। গালিনি মারে হোটেলের মালিক হারালামপোস সেভাস জানান যে, বুধবার বিকেলে প্রশাসনের নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ির বহর দিয়ে দ্রুত সেখানকার পর্যটকদের সম্পূর্ণ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জরুরি সাড়া কেন্দ্রের প্রধানও সতর্ক করে জানিয়েছিলেন যে আগামী কয়েক সপ্তাহে গ্রিস ও ইতালিতে দাবানলের ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশের মধ্যেও স্পেনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত কয়েক দিন ধরে স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে বিধ্বংসী আগুন জ্বলছে এবং এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হয়েছে। আগুনে স্পেনের বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমি সম্পূর্ণ ছাই হয়ে গেছে এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণী আগুনে পুড়ে মারা গেছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা অত্যন্ত সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে দেশটির সামনে আরও তিনটি অত্যন্ত কঠিন দিন অপেক্ষা করছে, কারণ এই সময়ে বাতাসে উচ্চ তাপমাত্রা ও তীব্র বেগের প্রবাহ অব্যাহত থাকবে। তবে রাজধানী মাদ্রিদ এবং আভিলা অঞ্চলের কিছু বড় দাবানল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় কর্তৃপক্ষ সেখানকার কিছু এলাকার ঘরবন্দি থাকার নির্দেশ ও অপসারণ আদেশ তুলে নিয়েছে। অন্যদিকে, স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জামোরা প্রদেশে নতুন করে আরেকটি ভয়ংকর দাবানল ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে কড়া সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং সেখানকার বেশ কয়েকটি শহরের বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্পেনের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির অন্তত ছয়টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে এবং সেখানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিস্থিতিও অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে। সেখানে চলমান ভয়াবহ দাবানলের কারণে তাপমাত্রা মঙ্গলবারের প্রায় তেত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এক লাফে একচল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে ফরাসি আবহাওয়া সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এর পাশাপাশি বিকেলের শুষ্ক ও তীব্র বাতাস আগুনকে নতুন করে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করছে। গত মঙ্গলবার রাতভর অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে ফরাসি দমকলকর্মীরা বোর্দোর পশ্চিমের একটি বড় দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। বোর্দো বিমানবন্দরের আশপাশের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে থাকলেও এবং বিমানবন্দর খোলা রাখা হলেও কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে বলেছেন যে সামগ্রিক সংকট এখনও কাটেনি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লেজ-ক্যাপ-ফেরে পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে ওই এলাকার বেশ কিছু স্থানে সুপ্ত আগুন নতুন করে জ্বলে উঠেছে, যা নেভাতে দমকলকর্মীদের চরম বেগ পেতে হচ্ছে। ট্রাক, পানির পাইপ এবং আকাশপথে বিশেষ বিমান ও হেলিকপ্টারের সাহায্যে বনভূমিতে ছড়িয়ে পড়া আগুন নেভানোর এই নিরলস লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

ফরাসি দমকল বাহিনীর কমান্ডার মাত্যু জোমাঁ সাংবাদিকদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বিকেলের দিকে বাতাসের গতিবেগও বহুগুণ বেড়ে যাবে, যে কারণে তারা পুরোপুরি সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। পর্যটকদের অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান বোর্দোর পশ্চিমের লঁদ এলাকার সুবিশাল পাইনগাছে ভরা প্রায় বিয়াল্লিশ হাজার হেক্টর বনভূমি ইতিমধ্যেই দাবানলে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। আগুন আটলান্টিক উপকূলের ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপের দিকে প্রবল বেগে ছড়িয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ সেখানকার প্রায় দুই লাখ বিশ হাজার স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। ওই উপদ্বীপে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটিও চরম হুমকির মুখে পড়েছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসায় প্রায় ষাট হাজার মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত ছোট সমুদ্রসৈকত শহর বিসকারোসের ১৮ বছর বয়সী তরুণ রাফায়েল ফোহানো তার বাবা-মায়ের পোড়া বাড়ির দৃশ্য দেখে সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে গেছেন। তিনি জানান যে মাত্র এক ঘণ্টা আগেও তিনি তার ঘরে ছিলেন, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে সবকিছু ছাই হয়ে গেছে। তার বাবা-মা ও বোনকে জীবন বাঁচাতে হেলিকপ্টার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

ফ্রান্সের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কিছু অংশে বজ্রঝড়, তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পাওয়া এবং বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধির ফলে দাবানলের ঝুঁকি সামান্য কমলেও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এখনো উচ্চ ঝুঁকি বজায় রয়েছে। এই চরম সংকটের মাঝেও কিছু অসাধু চক্রের তৎপরতা প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে যে গত কয়েক দিনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে চুরির অপরাধে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে খালি বাড়ি থেকে গয়না চুরির দায়ে একজন এবং আশ্রয়কেন্দ্র থেকে খাবার চুরির দায়ে দুজনকে আটক করা হয়েছে। এমনকি নিজেকে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্পেনের আভিলা ও মাদ্রিদের পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পূর্বাঞ্চলের কাস্তেইয়োনে দাবানল এখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সেখানে দশ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে এবং প্রায় দশ হাজার মানুষ এখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেননি। তবে এর মধ্যেও কাস্তেইয়োনের লা ভিলাভেয়া এলাকায় স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি পশুপচিকিৎসা হাসপাতাল আগুনের গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে। বারবার ঘটে চলা তীব্র তাপপ্রবাহ এবং দাবানলের কারণে ইউরোপের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, যা পুরো পৃথিবীকে এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত