তারেক রহমানের মদদে হামলা: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
তারেক রহমানের মদদে হামলা: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

প্রকাশ: ৩১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান নানা অস্থিরতা, সংঘাত এবং বহুমুখী উত্তেজনার মধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সিলেটের গোলাপগঞ্জে দলের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো বর্বরোচিত হামলা এবং দফায় দফায় বাধার মুখে পড়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার উত্তর বাজারে অনুষ্ঠিত অত্যন্ত জনবহুল ও প্রাণবন্ত জুলাই পদযাত্রা ও পথসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সরাসরি বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে অভিযোগ করেন যে, তাদের ওপর যে একের পর এক ন্যক্কারজনক ও পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলাগুলো চালানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ মদদেই সংঘটিত হয়েছে। এই বক্তব্য আসার পর পরই দেশের রাজনৈতিক মহলে এক তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে, যা আগামী দিনের রাজনীতিতে এক গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

কানাইঘাটের এই বিশাল পথসভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য প্রদানকালে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিগত কয়েক দিন ধরে তাদের দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ভয়াবহ সহিংসতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গোপন আলোচনার মাধ্যমেই মূলত এনসিপিকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত আঁটা হয়েছে। তবে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ জনগণকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না উল্লেখ করে তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে অত্যন্ত হুশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশে ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক ওসমান হাদিকে নির্মমভাবে হত্যা করে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলেও আজ দেশের আনাচে-কানাচে কোটি কোটি ওসমান হাদি জন্মগ্রহণ করেছে। যদি তাদের দলীয় নেতাদেরও চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবুও আজাদির এই কোটি কোটি নির্ভীক সৈনিক দেশের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার জন্য রাজপথে বুক চিতিয়ে নামতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

পথসভায় উপস্থিত হাজার হাজার উৎসারিত জনতার উদ্দেশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন যে, তাঁদের এই পথযাত্রায় কোনো অর্থ বা লোভ দেখিয়ে কাউকে ভাড়া করে আনা হয়নি, বরং সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভালোবেসে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কানাইঘাটের পথে পথে নানা কৌশলে সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওৎ পেতে ছিল এবং জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েই তাঁরা সাধারণ মানুষের টানে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি অতীতের ফ্যাসিবাদী আমলের বিভিন্ন নিপীড়নের স্মৃতিচারণ করে বলেন যে, গত সতেরো বছর ধরে যারা দেশে গণতন্ত্রের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে মুখে ফেনা তুলেছিল, তাঁরাই আজ ক্ষমতা পাওয়ার পর ফ্যাসিবাদের পুরোনো রূপ ধারণ করেছে। মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে পরিকল্পিতভাবে রাস্তার ওপর সারি সারি ভারী ট্রাক ফেলে রাখা হয়েছিল, যেগুলোর চাকা পাংচার করে দিয়ে রাস্তা সম্পূর্ণ চলাচলের অনুপযোগী করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আওয়ামী আমলের সেই পুরোনো হিংস্র চরিত্র নিয়েই পুলিশ বাহিনী তাদের গতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল বলে তিনি গুরুতর অভিযোগ তোলেন।

পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে এনসিপির এই শীর্ষ নেতা বলেন যে, সাধারণ পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের কোনো মৌলিক বিরোধ বা সমস্যা নেই, কারণ মাত্র বারো-তেরো হাজার টাকা বেতনে দিনরাত পরিশ্রম করা এসব সাধারণ সদস্য তাঁদেরই পরিবারের অংশ। অথচ সেই পুলিশ সদস্যদের ভুল বুঝিয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে এনসিপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর পরপরই রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাক্টর এবং প্রায় পাঁচশত পুলিশ সদস্য দিয়ে পুরো রাস্তাটি এমনভাবে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল, যা দেখে মনে হচ্ছিল এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং কোনো যুদ্ধক্ষেত্র। এপিবিএন, বিজিবি এবং এর পাশাপাশি ছাত্রদলের সশস্ত্র গুন্ডা ও সন্ত্রাসীরা দা, কুড়াল এবং রড নিয়ে রাস্তার ডান ও বাম উভয় পাশ থেকে ঘিরে ধরেছিল। এ দৃশ্য দেখে তিনি গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন যে, আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে হঠাৎ করে এই দা ও কুড়াল বাহিনী কোথায় থেকে আবিষ্কৃত হলো? স্থানীয় এক মুরুব্বি তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, এটি মূলত তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত বাহিনী।

তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও বিগত আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস টেনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন যে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ, এখানে রাজনীতি করতে হলে অবশ্যই গণতন্ত্রের পথ বেছে নিতে হবে। যদি তারা সন্ত্রাস এবং পেশিশক্তির পথকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে চান, তবে দেশের মুক্তিকামী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকে মোকাবিলা করতে তাঁরা পুরোপুরি প্রস্তুত আছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর যখন দেশের কারাগারের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছিল এবং বহু মানুষকে মুক্ত করা হয়েছিল, তখন তাঁরা মনে করেছিলেন যে বিগত দিনের অন্ধকার থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারায় ফিরে আসবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যাঁদের মুক্ত করার জন্য তাঁরা একসময় রাজপথে রক্ত দিয়েছিলেন এবং যাঁদের নেত্রীকে সসম্মানে দেশ থেকে বিদায় নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, সেই একই দল আজ নিজেদের স্বার্থে হায়নার মতো অস্ত্র হাতে তাঁদের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে বিএনপির প্রতি চারটি সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত কঠোর শর্ত বা দাবি পেশ করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন যে, নির্বাচনের আগে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছিল যে রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই চারটি প্রধান বিষয় বর্জন করতে হবে। প্রথমত, পুরো দেশ থেকে সমস্ত ধরনের চাঁদাবাজি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস ও সহিংসতা পরিহার করতে হবে। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের জমি ও সম্পদ দখলের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা অবিলম্বে কঠোর হাতে প্রতিহত করতে হবে। চতুর্থত, ভারতীয় আগ্রাসন বা যেসব অপশক্তি বাংলাদেশের আজাদি ও স্বাধীনতাকে গ্রাস করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। যদি এই কাজগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব না হয়, তবে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ও নেতৃত্ব থেকে ইস্তফা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন যে, এনসিপির কোনো গুন্ডা, সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজির প্রয়োজন নেই। হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের এই পুণ্যভূমির উত্তরসূরি হিসেবে দেশের মজলুম মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য তাঁরা আজীবন ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে অবিচল থাকবেন। কানাইঘাটের এই ঐতিহাসিক পথসভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত