ফটিকছড়িতে জমিতে চারা রোপণকালে কৃষকের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
ফটিকছড়িতে জমিতে চারা রোপণকালে কৃষকের মৃত্যু

প্রকাশ: ৩১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জীবিকার অন্বেষণে আপন ঠিকানা ছেড়ে দূর-দূরান্তে ছুটে চলা খেটে খাওয়া মানুষের একমাত্র সম্বল থাকে তাঁদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের সামর্থ্য ও বুকভরা কিছু সাধারণ স্বপ্ন। কিন্তু অনেক সময় সামান্য একটু অবহেলা কিংবা অপ্রত্যাশিত কোনো দুর্ঘটনা সেই স্বপ্নগুলোকে চিরতরে নিভিয়ে দেয়, যা পুরো পরিবারকে ঠেলে দেয় চরম অনিশ্চয়তা ও অতল অন্ধকারে। এমনই এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন মুস্তাকিম নামের এক সাধারণ কৃষি শ্রমিক। জীবিকার কঠিন লড়াইয়ে নেত্রকোনার নিজের শিকড় ছেড়ে চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও সমতল ঘেরা জনপদ ফটিকছড়িতে এসেছিলেন দুই মুঠো ভাতের জোগাড় করতে। কিন্তু নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাসে ক্ষেতের আইলে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করতে হলো তাঁকে। এই আকস্মিক ও অকালমৃত্যুতে নিহত শ্রমিকের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম এবং স্থানীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে গভীর শোকের ছায়া।

ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ফটিকছড়ি উপজেলার লেলাং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জনবহুল শাহনগর গ্রামের একটি উর্বর কৃষিজমিতে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভোরের আলো ফুটতেই কাজের তাগিদে দলবেঁধে মাঠে নেমেছিলেন বেশ কয়েকজন কৃষি শ্রমিক। নিহত মুস্তাকিম ছিলেন নেত্রকোনা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা এবং রিয়াজ উদ্দিনের সুযোগ্য সন্তান। পরিবারের অভাব অনটন দূর করার সুদৃঢ় জেদ আর কষ্টের সংসার সচল রাখার তাগিদেই তিনি সুদূর নেত্রকোনা থেকে চট্টগ্রামে এসে বিভিন্ন কৃষিকাজে অংশ নিতেন। ঘটনার দিন সকালে মুস্তাকিমসহ আরও কয়েকজন সহকর্মী শ্রমিক লেলাং ইউনিয়নের সন্ন্যাসীরহাট এলাকার স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি চেয়ারম্যান শাহীনের বাড়ির ঠিক সামনের একটি বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে আমন বা অন্য কোনো ফসলের ধানের চারা রোপণ করার উদ্দেশ্যে মাঠে নামেন। বর্ষাকালীন বা সেচ দেওয়া জলে পরিপূর্ণ কাদামাখা সেই জমিতে তখন কাজের বেশ ব্যস্ততা চলছিল, কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে ঠিক কোন ভয়ংকর বিপদ তাঁদের গ্রাস করার জন্য ওত পেতে বসে আছে।

স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায় যে, ঝোড়ো হাওয়া বা অন্য কোনো কারণে আগে থেকেই পল্লী বিদ্যুতের একটি লাইভ বা সচল ছেঁড়া তার হেলে পড়ে জমির থিকথিকে পানিতে ডুবে ছিল। কিন্তু চারপাশের সবুজ ঘাস, কাদামাটি ও জলের রঙে সেই মারাত্মক তারটি মিশে থাকায় মাঠে নামা শ্রমিকদের কারোরই চোখে তা পড়েনি। সম্পূর্ণ অজেয় ও অজ্ঞাতসারে মুস্তাকিমসহ অন্য শ্রমিকরা যখন ধানের চারা হাতে নিয়ে জমিতে নেমে কাজ শুরু করেন, তখন চরম অসাবধানতাবশত মুস্তাকিম সেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট পানির সরাসরি সংস্পর্শে চলে আসেন। মুহূর্তের মধ্যে বৈদ্যুতিক প্রবাহ তাঁর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তবে পরম সৌভাগ্যবশত তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য শ্রমিকরা একটু দূরে থাকায় এবং বিষয়টির ভয়াবহতা দ্রুত বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক হওয়ায় অল্পের জন্য বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পান। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক কাণ্ড দেখে সহকর্মীদের আর্তনাদে চার Oপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

সহকর্মী শ্রমিকদের চিৎকার ও কান্নাকাটি শুনে আশপাশের ক্ষেতে কাজ করা অন্য কৃষকরা ও স্থানীয় এলাকাবাসী দ্রুত দৌড়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছেন হতভাগ্য মুস্তাকিম। খবরটি মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও উৎসুক জনতা সেখানে ভিড় জমান। এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় নিহতের সহকর্মীদের চোখ ছিল অশ্রুসিক্ত, কারণ যাঁদের সঙ্গে মাত্র কিছুক্ষণ আগেও হাসিমুখে কাজ করছিলেন, মুহূর্তের মধ্যে তাঁদের একজন চিরকালের মতো নীরব হয়ে গেলেন। গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ লাইনের বেহাল দশা এবং অরক্ষিত তারের কারণে এমন প্রাণহানির ঘটনা অতীতেও ঘটেছে বলে স্থানীয় ক্ষুব্ধ কৃষকরা অভিযোগ করেন। সামান্য একটু সচেতনতা বা বিদ্যুৎ বিভাগের দ্রুত পদক্ষেপ থাকলে হয়তো মুস্তাকিমের মতো একজন তরতাজা প্রাণ এভাবে ঝরে যেত না বলে তারা মন্তব্য করেন।

সংবাদ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে এলাকার স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আজম গণমাধ্যমকে জানান যে, জমিতে আগে থেকেই বিদ্যুতের একটি ছেঁড়া তার পড়েছিল এবং অসাবধানতাবশত শ্রমিকরা তা না দেখেই কাজ করতে নামায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। ফটিকছড়ি থানার সুযোগ্য অফিসার ইনচার্জ বা ওসি রবিউল আলম খান এই মর্মান্তিক বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান যে, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশ দল পাঠিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর নিহত শ্রমিকের মরদেহ তাঁর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। অভাবের তাড়নায় ঘর ছেড়ে আসা একজন শ্রমিকের এমন করুণ মৃত্যু পুরো ফটিকছড়ি অঞ্চলে এক গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত