চার দশকেও কাটেনি বকশীগঞ্জ কারাগারের অচলাবস্থা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
চার দশকেও কাটেনি বকশীগঞ্জ কারাগারের অচলাবস্থা

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় নির্মিত একটি পূর্ণাঙ্গ সাব-জেল বা উপকারাগার দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর ধরে চালুর অপেক্ষায় থেকে কেবল একটি পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন সময়ে বিশাল ভূখণ্ড ও বিশাল অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় করে এই কারাগারটির নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করা হলেও আজ অব্দি তা উদ্বোধনের মুখ দেখেনি। নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা, আইনি মারপ্যাঁচ এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে চার দশক ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে জাতীয় সম্পদের এক চরম অপচয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের এক বড় ধরনের ব্যর্থতার নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সীমান্তবর্তী এই জনপদের মানুষের নিরাপত্তা ও বিচারিক কার্যক্রমের সুবিধার্থে নির্মিত এই কারাগারটি চালুর উদ্যোগ অতীতে বারবার নেওয়া হলেও তা কেবল ফাইলবন্দি হয়েই থেকে গেছে, যা স্থানীয় সচেতন মহলে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে।

ঐতিহাসিক ও পুরোনো সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায় যে প্রায় দুই দশমিক সাত তিন একর বা দেশীয় মাপে প্রায় আট বিঘারও বেশি সুপরিসর জমির ওপর অত্যন্ত পরিকল্পনা করে এই সাব-জেল কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই সময় গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জন্য পরিকল্পিত এই পূর্ণাঙ্গ উপকারাগারটিতে বন্দিদের বসবাসের জন্য নিরাপদ ব্যারাক, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা ভবন, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসবাসের জন্য আবাসিক কোয়ার্টার, বন্দিদের শারীরিক সুস্থতার জন্য একটি খেলার মাঠ এবং বর্জ্য নিষ্কাশন ও পানির সুবিধার জন্য একটি বড় পুকুর খনন করা হয়েছিল। তবে সে সময় ঠিক কত টাকা ব্যয় করে এই কারাগার নির্মাণ করা হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক হিসাব বা তথ্য এখন আর পাওয়া যায় না। মূলত সে সময়ে বকশীগঞ্জসহ আশপাশের সীমান্তবর্তী ও দূরবর্তী অঞ্চল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধী ও আসামিদের জামালপুর জেলা কারাগারে আনা-নেওয়ার দীর্ঘ পথ ও নানাবিধ নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি কমানোর মহৎ উদ্দেশ্যেই এই কারাগারটি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অজানা প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার না হওয়ার ফলে বর্তমানে কারাগারটির প্রাচীন ভবনগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং জানালা-দরজার কাঠের ও লোহার অনেক মূল্যবান অংশ ইতিমধ্যে নষ্ট ও চুরি হয়ে গেছে। কারাগারটির পুরো চত্বরজুড়ে এখন ঘন ঝোপঝাড় ও আগাছায় ভরে গেছে, যার ফলে দিনের বেলাতেও স্থানটি একটি ভৌতিক ও জনমানবশূন্য পরিবেশে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হয়েছে যে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের নজরদারি না থাকার কারণে সরকারি এই মূল্যবান ও বিশাল সম্পত্তির কিছু অংশ স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল ও চাষাবাদের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। যদি এখনই সরকার বা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ এই সম্পত্তি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ না নেয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে পুরো আট বিঘার এই জনবহুল এলাকাটি সম্পূর্ণ বেদখলের ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি ও অধ্যাপক আফসার আলী আক্ষেপ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান যে এরশাদ সরকারের আমলে বকশীগঞ্জে এই জেলখানা নির্মিত হলেও কোনো এক রহস্যজনক কারণে এর কার্যক্রম আর চালু করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে বিশাল পরিমাণ সরকারি জমি ও সম্পদ এভাবে আজ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন যে এই কারাগারের মূল ঐতিহাসিক গঠন ও কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে যদি এর ভেতরে একটি শিশু বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়, তবে একদিকে যেমন এই পুরনো জেলখানার স্মৃতি সংরক্ষিত থাকবে, অন্যদিকে এলাকার শিশুরা একটি সুন্দর বিনোদন স্থান ও আনন্দ উপভোগের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি এই চত্বরে একটি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘর নির্মাণ করা হলে অত্র অঞ্চলের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবে। সরকারি এই পরিত্যক্ত সম্পত্তিকে জনকল্যাণে লাগানোর এমন চমৎকার সব পরামর্শ এলাকাবাসীর মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোসা. কনিকা খাতুন জানিয়েছেন যে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি ২০০৩ সালে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি সিদ্ধান্তে দেখভালের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এরপর থেকেই বকশীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এই পরিত্যক্ত জেলখানা, খালি মাঠ এবং ভেতরের পুকুরটিকে বিভিন্ন উপায়ে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করার জন্য নানা ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে খুব দ্রুতই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিবাচক নির্দেশনা ও বরাদ্দ এলে তারা এই পরিত্যক্ত স্থাপনাটিকে স্থানীয় জনগণের সেবামূলক কোনো প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে সক্ষম হবেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুরাদ হোসেন অত্যন্ত আশাবাদী সুরে জানান যে বকশীগঞ্জের এই পরিত্যক্ত উপ-কারাগারটি বর্তমানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি অধীনে রয়েছে এবং এই পরিত্যক্ত কারাগারটিকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে একটি কার্যকর সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোরালো পদক্ষেপ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত