প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদ পরিবার এবং বর্বরোচিত হামলায় গুরুতর আহত বীর যোদ্ধাদের সুনিশ্চিত আবাসন সুবিধা প্রদানের এক বিশেষ ও যুগান্তকারী সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ তাদের জন্য আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের সুমহান কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর हालেই প্রদত্ত এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমের কাছে এই আশাব্যঞ্জক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী আগস্ট মাসের একদম শেষ সপ্তাহ কিংবা সেপ্টেম্বরের একেবারে প্রথম সপ্তাহের যেকোনো একটি সুবিধাজনক দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই জনকল্যাণমূলক আবাসন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা আনুষ্ঠানিক শুভউদ্বোধন করবেন বলে তারা জোরালোভাবে আশা প্রকাশ করছেন।
নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার পরবর্তী সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে এই আবাসন প্রকল্পের পুরো নির্মাণ ও বাস্তবায়ন কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় মোট চোদ্দটি সুউচ্চ বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে, যেগুলোতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া এবং দেশের জন্য লড়াই করে গুরুতর আহত হওয়া বীর ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হবে। রাজধানী ঢাকার মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জনবহুল ও ব্যয়বহুল স্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করতে পারাটা কেবল একটি সাধারণ গৃহায়ন উদ্যোগ নয়, এটি হবে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে একটি অত্যন্ত বড় ও কার্যকর সহায়তা। প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, এই মহৎ আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগী পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আরও বেশি নিরাপদ ও সুনিশ্চিত জীবনযাপন করতে পারবে। এই প্রকল্পটি নিছক ইট-পাথরের কোনো সাধারণ আবাসন প্রকল্প নয়, বরং এটি সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি অনন্য প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ।
প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে যাঁরা নিজেদের তাজা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন কিংবা পঙ্গুত্ববরণ করে গুরুতর আহত হয়েছেন, তাঁদের এই অসামান্য ও ঐতিহাসিক অবদান এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ কখনো কোনো দিনই ভুলবে না। সেই শহীদ ও আহতদের পাশাপাশি তাদের প্রিয় পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের যে সুমহান দায়বদ্ধতা রয়েছে, তারই একটি অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার এই আবাসন প্রকল্প অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে চলেছে। আহম্মদ সোহেল মনজুর আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, এটি তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে কোনো ধরনের প্রতিদান বা মূল্য পরিশোধ নয়, কারণ এ দেশের জন্য তাঁদের যে মহান অবদানের ঋণ, তা কোনো কিছুর মাধ্যমেই পুরোপুরি পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতার একটি স্থায়ী প্রতীক হিসেবে আমরা তাদের জন্য রাজধানী ঢাকায় স্থায়ী আবাসনের সুব্যবস্থা করে দিচ্ছি। সরকার এরই মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন ধরনের বহুমুখী সহায়তা কার্যক্রম অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনা করে আসছে, যার মধ্যে নিয়মিত মাসিক ভাতা প্রদান, উন্নত চিকিৎসা সহায়তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম এখনো নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে।
সরকারি এসব প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবেও শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে তাঁর নিজের জেলা পিরোজপুরে জুলাই অভ্যুত্থানে যতজন মানুষ শহীদ বা আহত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের পরিবারের সঙ্গে তিনি নিজে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং তাঁদের যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও সংকটকালে সাধ্যমতো সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরে তিনি বলেন যে, এই অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানকে কেবল জুলাই মাসের একটি বিচ্ছিন্ন বা হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই, বরং এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলা স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরই এক অবিসংবাদিত ও চূড়ান্ত ধারাবাহিক পরিণতি। আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন যে, জুলাই বিপ্লব একদিনে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি, এটি দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও সুদীর্ঘ সংগ্রামের সুমিষ্ট ফসল। অতীতের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার পথ ধরেই শেষ পর্যন্ত দেশের আপামর ছাত্র-জনতার অদম্য ও ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণের মাধ্যমে ৫ আগস্ট সেই ঐতিহাসিক ও পরিবর্তনকারী মুহূর্তটির সৃষ্টি হয়েছিল।
বিগত ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী সরকারের আমলের দুঃশাসনের কথা স্মরণ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন যে, সে সময় ধারাবাহিকভাবে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ন্যায্য দাবি ও জনঅসন্তোষ আরও বহুগুণ তীব্র আকার ধারণ করেছিল। সেই চরম সংকটময় প্রেক্ষাপটেই ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচারী শাসনামলের নানা ধরনের নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় গুম, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং নিজেদের ভোটাধিকার নির্মমভাবে হরণের অভিযোগে ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও জর্জরিত ছিল। সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বঞ্চনাই শেষ পর্যন্ত একটি অপ্রতিরোধ্য গণ-আন্দোলনের রূপ ধারণ করে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সাফল্যের মধ্য দিয়ে তার বিস্ফোরক প্রকাশ ঘটেছিল।
সবার সম্মিলিত ও সর্বাত্মক অংশগ্রহণের কারণেই যে জুলাই আন্দোলন চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পেরেছিল, সে কথা পুনর্ব্যক্ত করে আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের মেধাবী ছাত্রসমাজের পাশাপাশি আপামর সাধারণ মানুষের সাহসী অংশগ্রহণই ছিল এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ও মূল শক্তি। অত্যন্ত আলোচিত জুলাই সনদ বা ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গে তিনি সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন যে, বর্তমান সরকার এই বিষয়ে শুরু থেকেই অত্যন্ত আন্তরিক এবং জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে গৃহিত প্রতিটি সিদ্ধান্ত অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আহম্মদ সোহেল মনজুর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন যে, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্বচ্ছ; জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের জন্য এই সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাবে। এটিকে আমরা আমাদের পবিত্র নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচনা করি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল থেকে এই মহান অর্জনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার নানামুখী ষড়যন্ত্র বা অপচেষ্টা চালানো হলেও সরকার জুলাই সনদের মূল চেতনা বাস্তবায়নে সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি স্বীকৃতির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেটভুক্ত নিহত ও গুরুতর আহত ব্যক্তিদের নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করেছে এবং সেই তালিকার ভিত্তিতেই তাদের জন্য বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, গেজেটভুক্ত নিহত ও আহতদের নিয়মিত ভাতা প্রদান, উন্নত চিকিৎসা সহায়তা এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক কার্যক্রম বর্তমানে নিয়মিতভাবে অব্যাহত রয়েছে, এবং আসন্ন আবাসন প্রকল্পটি হলো সেই ধারাবাহিক ও বৃহৎ কল্যাণমূলক উদ্যোগেরই একটি অংশ মাত্র। রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের সুফল যেন বৈষম্যহীনভাবে দেশের এই আত্মত্যাগী পরিবারগুলোর দোরগোড়ায়ও পৌঁছে যায়, সে বিষয়টি বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করছে। পরিশেষে প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, জুলাই মাসের বীর যোদ্ধাদের প্রতি জাতির যে গভীর ঋণ রয়েছে, তা কোনো দিনই পুরোপুরি শোধ করার মতো নয়; কিন্তু তাঁদের প্রতিটি পরিবার যেন এই সমাজে মাথা উঁচু করে অত্যন্ত নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে, সেই লক্ষ্যেই সরকার সর্বশক্তি দিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।