তরুণদের আন্দোলনে নরেন্দ্র মোদি দুর্বল হয়েছেন: সোনম ওয়াংচুক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
তরুণদের আন্দোলনে নরেন্দ্র মোদি দুর্বল হয়েছেন: সোনম ওয়াংচুক
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি এক অভাবনীয় এবং যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লি থেকে শুরু করে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে যে স্বতঃস্ফূর্ত ও বিশাল গণবিক্ষোভ গড়ে উঠেছে, তার তীব্র অভিঘাতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক অবস্থান বহুলাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের অন্যতম সুপরিচিত ও স্বনামধন্য পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো দেশের অন্যতম প্রধান দুর্নীতি ও সংকটের প্রতিবাদে এবং তৎকালীণ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সোচ্চার হওয়া তরুণদের এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে তিনি দীর্ঘ ২৬ দিন অনশন করেছিলেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক ও কঠোর অনশন কর্মসূচি সাধারণ তরুণদের মনে এক নতুন বিপ্লবের আগুন জ্বেলে দিয়েছিল এবং পুরো আন্দোলনকে এক অবিশ্বাস্য মাত্রায় উজ্জীবিত ও বেগবান করেছিল।
তরুণদের সেই গণবিক্ষোভের চরম চাপের মুখে পড়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বাধ্য হয়ে তাঁর পদ থেকে পদত্যাগ করেন, যা সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভারতের সুপরিচিত পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, দেশের তরুণ সমাজের এই ঐতিহাসিক গণবিক্ষোভের পর ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের জনমনে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এই আন্দোলনের ফলে দেশের তরুণেরা এখন মানসিকভাবে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সচেতন হয়ে উঠেছে। তারা এখন খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে যে, সম্মিলিত ইচ্ছা এবং অটুট ঐক্যের শক্তির মাধ্যমে তারা চাইলে যেকোনো অন্যায় পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দিতে সক্ষম। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া কোনো অন্যায় বা অপছন্দের সিদ্ধান্ত তারা এখন আর নীরবে মাথা পেতে মেনে নিতে বাধ্য নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা মাথা উঁচু করে প্রতিবাদ করতে শিখেছে।
ভারতের বর্তমান রাজনীতিতে ২০১৪ সাল থেকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে দেশের ভেতরে যে কয়েকটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কঠিন গণ–আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তার মধ্যে ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে সংঘটিত জুন ও জুলাই মাসের এই তরুণ প্রজন্মভিত্তিক আন্দোলনটি ছিল অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী। নতুন দিল্লির যন্তর মন্তরে এবং দেশের অন্যান্য শহরে সংঘটিত এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল মূলত জেন–জি বা জেনারেশন জেড হিসেবে পরিচিত দেশের ক্ষুব্ধ ও উদ্যমী তরুণ সমাজ। ৫৯ বছর বয়সী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক দিল্লির তীব্র গরম ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে একটানা ছাব্বিশ দিন ধরে কঠোর অনশন পালন করেন। এই দীর্ঘ অনশনকালে তিনি অত্যন্ত কঠিন সংযম অবলম্বন করে কেবল সামান্য লবণ ও পানি গ্রহণ করে জীবন ধারণ করেছিলেন। যার ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং তাঁর শরীরের ওজন প্রায় এগারো কেজি কমে গিয়েছিল, যা তাঁর শারীরিক সুস্থতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল।
নতুন দিল্লির যন্তর মন্তরের অনশনস্থল থেকে দিল্লি পুলিশ অত্যন্ত কঠোরহস্টে সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি হাসপাতালে ভর্তি করে। ওই হাসপাতালের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান যে, অনশনের শেষ ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার সময় তাঁর অবচেতন মনে বারবার এমনটাই মনে হয়েছে যে তিনি আসলে কোনো সাধারণ চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন নেই, বরং তাঁকে জোর করে একটি অন্ধকার কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তবে পুলিশি কড়াকড়ি এবং তাঁকে জোর করে হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়ার ন্যাক্কারজনক ওই পদক্ষেপে তরুণদের আন্দোলন দমে যাওয়ার পরিবর্তে উল্টো আরও বেশি তীব্র ও বেগবান হয়ে ওঠে। এটি ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও সফল সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। অবশেষে ওয়াংচুক অনশন ভঙ্গ করার পরদিনই তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজের পদ থেকে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা দেয় সরকার এবং দেশের ভঙ্গুর পরীক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রযুক্তি খাতের একজন শীর্ষস্থানীয় বিলিয়নিয়ারকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
শিক্ষাব্যবস্থার এই গভীর সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সোনম ওয়াংচুক উল্লেখ করেন যে, ভারতে এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত রয়েছে এবং গত পঁচিশ বছর ধরে দেশের গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বিশাল একটি অংশের মধ্যে বেকারত্বের হার স্থায়ীভাবে প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশের আশপাশে ওঠানামা করছে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বাস্তব কর্মসংস্থানের চাহিদার বা বাজারের বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল নেই বললেই চলে। অধিকাংশ পরীক্ষাই বর্তমানে প্রথাগত বহু নির্বাচনী প্রশ্ন বা এমসিকিউ নির্ভর হয়ে পড়েছে, যার একমাত্র প্রধান উদ্দেশ্য হলো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করা। কিন্তু এই ধরনের অগভীর পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ব্যবহারিক দক্ষতা, সৃজনশীল প্রতিভা এবং পঠিত বিষয়ের গভীর বোধশক্তি কতটা অর্জন করতে পেরেছে, তা যাচাই করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। দেশের স্কুলগুলোও সেই ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষাকেন্দ্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান করে চলেছে। শিক্ষার এই আত্মিক সংকটের অবসান ঘটিয়ে বেকারত্ব সমস্যা দূর করতে দেশজুড়ে একটি ব্যাপক ও মৌলিক পরিবর্তন আনার সময় এখনই এসেছে বলে মনে করেন এই পরিবেশ আন্দোলনকর্মী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত