শেখ পরিবারের সবাই নিরাপদে বাইরে, কারাগারে দলের কর্মীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার
শেখ পরিবারের সবাই নিরাপদে বাইরে, কারাগারে দলের কর্মীরা
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক চরম পালাবদল ও ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগ এবং বর্তমান অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। বিগত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শেখ পরিবার ও তাদের নিকটাত্মীয়দের প্রায় সবাই চাতুর্যের সঙ্গে এবং পূর্বপরিকল্পিত উপায়ে সরকার পতনের আগে ও পরে সম্পূর্ণ নিরাপদে দেশের সীমানা পার হয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে সক্ষম হয়েছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময় ধরে যারা দলের বিভিন্ন স্তরে অন্ধভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং এই পরিবারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে রাজপথে সম্মুখভাগে লড়েছেন, সেই আওয়ামী লীগের বহু মন্ত্রী, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতাসহ হাজার হাজার সাধারণ কর্মী আজ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি জীবনযাপন করছেন কিংবা দেশের ভেতরে চরম মানবেতর অবস্থায় আত্মগোপনে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ছাত্র-জনতার চরম আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার নানামুখী ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকার পতনের ঠিক আগের দিনগুলোতেও যখন ঢাকাসহ সারা দেশের রাজপথ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের রক্তে ও মিছিলে উত্তাল, তখনো এই পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যরা নিজেদের নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র এবং শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপস সিঙ্গাপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে গিয়ে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের বাধার মুখে পড়েন। সেই সংকটময় মুহূর্তে তিনি সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে নিজের বিদেশ যাত্রার জন্য বিশেষ অনুমতি ও সহায়তা প্রার্থনা করেছিলেন। কথোপকথনের সেই অডিও রেকর্ড পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর চরম স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
সে সময় সাধারণ ছাত্র-জনতা যখন রাজপথে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত অবস্থায় একে একে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন, তখন এই পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের ও পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত ছিলেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্টের ওই দিনটি ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত মোড়। সেদিন বিকেলে রাজধানীর ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের বাঁধভাঙা উপস্থিতিতে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ সমন্বয়ক সরকারের পতনের এক দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই সেনা সদরের এক গুরুত্বপূর্ণ দরবারে সাধারণ মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে জোরালো মতামত উঠে এসেছিল। সরকারের চরম নড়বড়ে ও পতন আসন্ন অবস্থা অনুধাবন করতে পেরে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে তাপসসহ প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজনরা অত্যন্ত নিভৃতে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
শেখ হাসিনার পরিবারের প্রায় দুই ডজন সদস্য বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা দলের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তাঁদের প্রায় সবাই অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে গ্রেপ্তার এড়িয়ে নিরাপদে দেশত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে মঈন উদ্দিন আবদুল্লাহ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হন, যিনি মূলত রাজনৈতিকভাবে ততটা সক্রিয় ছিলেন না এবং প্রধানত ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেভাবে আত্মগোপনও করেননি। বাকি প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজনদের সবাই সঠিক সময়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কিংবা আকাশপথে দেশ ছেড়ে চলে যান। বর্তমান প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই পরিবারের পলাতক সদস্যদের সিংহভাগের বর্তমান নিরাপদ ঠিকানা ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন সুউচ্চ ও দামি আবাসিক ফ্ল্যাট, যেখানকার নানা ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
সরকার পতনের দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে যখন সামরিক হেলিকপ্টারে করে দেশ ত্যাগ করেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানাও কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি হয়ে ভারতে চলে যান। শেখ রেহানা যুক্তরাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও দীর্ঘ শাসনামলে তিনি দেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে বোনের ছায়াসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্য এবং ভারতের বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তা ছাড়া শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন এবং কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কার্যালয়ের দায়িত্বে দিল্লির দপ্তরে কর্মরত থাকায় তিনি আগেই ভারতের মাটিতে অবস্থান করছিলেন। শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলসহ পরিবারের প্রতিটি শীর্ষস্থানীয় সদস্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দেশ ত্যাগ করে বর্তমানে ভারতে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছেন।
অন্যদিকে, এই পরিবার ও তাদের আশীর্বাদপুষ্ট শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিরাপদে বিদেশে পাড়ি জমাতে সক্ষম হলেও আওয়ামী লীগের বিশাল রাজনৈতিক কাঠামোর সাধারণ ও মাঝারি সারির নেতাকর্মী এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের ভাগ্য ততটা সুপ্রসন্ন ছিল না। সরকার পতনের পরপরই দেশজুড়ে সাধারণ ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তৎকালীন সরকারের প্রায় তিন ডজনের মতো সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং অর্ধশতার্ধিক সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা একে একে গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতারা। রাজনীতিবিষয়ক বিশিষ্ট গবেষক ও লেখকদের মতে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দর্শনের মূলে ছিল নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও তীব্র জ্ঞাতি-গোষ্ঠীপ্রীতি, যা তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু যখন নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি, তখন তিনি দলের লক্ষ লক্ষ সাধারণ নেতাকর্মীকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে রেখে কেবল নিজের পরিবারের সদস্যদেরই নিরাপদে পলায়ন নিশ্চিত করেছেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নির্মম ও ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অঙ্কিত থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত