প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত একশো পঞ্চাশ একর বিরোধপূর্ণ জমির দখল ফিরে পাওয়াকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সংরক্ষিত বনের এই জমি নিয়ে বন বিভাগ এবং স্থানীয় ইছলাছড়া পুঞ্জির খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যকার বিরোধ দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সরাসরি মধ্যস্থতায় এই জমির দখল পুঞ্জির লোকজনের হাতে চলে যাওয়ায় প্রশাসন ও সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আদালতে মামলা চলমান থাকা এবং স্থিতাবস্থার আদেশ জারি থাকার পরও কীভাবে এমন একটি সমঝোতা হলো, তা নিয়ে জনমনে গভীর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড় ঘেরা এই জনপদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনজীবিকা এবং বনভূমির আইনি সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের আবহ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, বন বিভাগ ও পুঞ্জির বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বরমচাল ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্টের মোট আয়তন এক হাজার একানব্বই দশমিক ষাট একর। দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে অর্থাৎ ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ আমলে এটিকে সরকারিভাবে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এই বিশাল বনভূমির ভেতরেই গড়ে উঠেছে ইছলাছড়া পুঞ্জি, যেখানে খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের প্রায় ষাট থেকে সত্তরটি পরিবার অত্যন্ত দুর্গম ও প্রান্তিক জীবনযাপন করে আসছে। এই পুঞ্জির বাসিন্দাদের প্রধান অর্থনৈতিক অবলম্বন হলো পান চাষ ও তা বিক্রি করা। তবে এই বনের ভেতরে অবস্থিত একশো পঞ্চাশ একর জমির মালিকানা ও অধিকার নিয়ে বন বিভাগের সাথে পুঞ্জির লোকজনের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বিরোধ চলে আসছে। দুই পক্ষই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একাধিক মামলা দায়ের করেছে, যা বর্তমানে বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
আইনি জটিলতার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাঝেও প্রায় দশ থেকে পনেরো বছর আগে এলাকার প্রভাবশালী ষোলজন ব্যক্তি বিরোধপূর্ণ এই বনের জমি বলপ্রয়োগ করে দখল করে নেন এবং সেখানে লাভজনক বাণিজ্যিক গাছের বাগান গড়ে তোলেন। ওই জমিতে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। পরবর্তীতে ২০২২ সালে দখলকারীরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে টিপু চৌধুরী নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে ষোলো লক্ষ টাকার বিনিময়ে ওই বাগানের সমস্ত গাছ বিক্রি করে দেন। এরপর ক্রেতা টিপু চৌধুরী প্রায় পাঁচশো গাছ কেটে ফেললে বিষয়টি বন বিভাগের নজরে আসে এবং বনকর্মীরা গিয়ে গাছ কাটায় তাৎক্ষণিক বাধা দেন। এই অবৈধভাবে গাছ কাটার ঘটনায় বন বিভাগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের করেছিল, যা বন রক্ষার ক্ষেত্রে একটি কঠোর বার্তা দিলেও জমির দখল উদ্ধারে কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।
পরিস্থিতির নতুন মোড় নেয় যখন ইছলাছড়া পুঞ্জির লোকজন বাগানমালিকদের কাছ থেকে জমি পুনরুদ্ধারের জন্য মৌলভীবাজার-দুই কুলাউড়া আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলামের শরণাপন্ন হন। পুঞ্জির বাসিন্দাদের এমন আকুতির পর সংসদ সদস্য স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ডেকে বিষয়টি দ্রুত সমাধান করে দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে। নেতার নির্দেশের পর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা দুই পক্ষকে নিয়ে একটি গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, বাগানমালিকরা জমি ছেড়ে দেবেন এবং এর বিনিময়ে গাছের মূল্য ও ক্ষতিপূরণ বাবদ পুঞ্জির পক্ষ থেকে তাদেরকে উনিশ লক্ষ টাকা পরিশোধ করা হবে। প্রয়োজনীয় এই অর্থ লেনদেন ও দেনদরবার সম্পন্ন হওয়ার পরই বাগানমালিকেরা বিরোধপূর্ণ জমির দখল ছেড়ে দেন এবং পুঞ্জির লোকজন সেখানে পুনরায় প্রবেশাধিকার লাভ করেন।
সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম একটি সমঝোতা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে আদালত কর্তৃক জমির ওপর স্থিতাবস্থার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এই মধ্যস্থতা করিয়ে দিলেন এবং আইনকে উপেক্ষা করলেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট সন্তোষজনক জবাব দেননি। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতা ও বরমচাল ইউনিয়নের সহসভাপতি আবদুল লতিফ এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোক্তাদীরের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে স্থানীয় বিএনপি নেতারা সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতাতেই যে এই সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে তা স্বীকার করলেও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে কোনো পরিষ্কার মন্তব্য করতে চাননি। তারা দাবি করেছেন যে এলাকার শান্তি ও দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটানোর জন্যই কেবল এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এদিকে জমির দখল ফিরে পাওয়ার পর গত পঁচিশ জুলাই পুঞ্জির চারজন বাসিন্দা বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রবেশ করে সমস্ত ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেন এবং সেখানে নতুন করে সুপারিগাছের চারা রোপণ করেন। এ সময় বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজন বাধা দিতে গেলে পুঞ্জির ওই ব্যক্তিরা তাদের প্রকাশ্যে ধমক দেন ও তাচ্ছিল্য করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের ঘটনায় বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করেন। এর পরপরই ছাব্বিশ জুলাই কুলাউড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার ভূমি প্রণয় বিশ্বাস নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। ইছলাছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা জন ছেল্লা গণমাধ্যমকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে এই জমি তাদের নিজেদের এবং সংসদ সদস্য মহোদয় যেহেতু এর একটি সমাধান করে দিয়েছেন, তাই তারা কোনো অবস্থাতেই এই জমির দখল আর ছাড়বেন না।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়েছে যে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে এবং সংরক্ষিত বনের জমি জবরদস্তি করে দখলের এই চেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি। সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোক্তার হোসেন প্রথম আলোকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বিরোধপূর্ণ বনভূমি জবরদখল ও দখলের চেষ্টার এই পুরো বিষয়টি তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবিহিত করেছেন এবং এ ব্যাপারে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আদালতের স্থিতাবস্থা বলবৎ থাকা অবস্থায় কোনো পক্ষ কীভাবে এ ধরনের সমঝোতা করতে পারে, তা নিয়ে তিনি গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন। বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা এবং সরকারের আইন সমুন্নত রাখতে বন বিভাগ তার আইনি লড়াই ও অভিযান অব্যাহত রাখবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ জহিরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে বিরোধপূর্ণ এই জমি নিয়ে এলাকায় যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ শুরু থেকেই অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যেহেতু এই জমি নিয়ে উচ্চ আদালতে স্থিতাবস্থা জারি রয়েছে, তাই পুলিশ প্রশাসন দুই পক্ষকেই থানায় ডেকে বা সরাসরি যোগাযোগ করে আদালতের আইনগত নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এলাকায় পুলিশের নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আইনপ্রণেতার মধ্যস্থতায় বনের সংরক্ষিত জমি নিয়ে এই অভিনব সমঝোতা ও দখল উদ্ধারের ঘটনা পুরো কুলাউড়া জুড়ে এক নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষ এখন এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একটি স্থায়ী ও আইনানুগ সমাধান দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।