১০ জেলায় ফের বন্যার চোখ রাঙানি, চরম উৎকণ্ঠায় নদীতীরবর্তী মানুষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৭ বার
১০ জেলায় ফের বন্যার চোখ রাঙানি, চরম উৎকণ্ঠায় নদীতীরবর্তী মানুষ
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিভিন্ন জনপদে দীর্ঘস্থায়ী জলমগ্নতার ক্ষতচিহ্ন ও ধকল পুরোপুরি কেটে ওঠার আগেই প্রকৃতি নতুন করে এক নির্মম পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে লাখো মানুষকে। চলমান বর্ষার মৌসুমে স্বস্তির সুবাতাস বইতে না বইতেই আবারও নতুন করে ভয়াবহ বন্যার কালো ছায়া নেমে এসেছে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে। গত কয়েক দিন ধরে চলা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা অবিরাম পাহাড়ি ঢলের পানির তীব্র চাপে দেশের অন্তত ১০টি জেলার নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশেষ সতর্কবার্তায় এই শঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। এই আকস্মিক পদক্ষেপে দেশের লাখো খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক এবং নদীতীরবর্তী জনপদের বাসিন্দারা নতুন করে চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের ১০টি প্রধান জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এই ঝুকিপূর্ণ জেলাগুলোর তালিকার মধ্যে রয়েছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, শেরপুর, ময়মনসিংহ এবং নেত্রকোনা। মূলত ভারতের উজানের পাহাড়ি এলাকায় অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে নদনদীগুলোর পানি অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দেশের প্রধান নদনদীসমূহের পানি খুব দ্রুত বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা এবং চরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের কষ্টের ফসল ও গবাদি পশু নিয়ে অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন।
নদ-নদীর পানির এই দ্রুত বৃদ্ধির ফলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই অঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী দুই দিন ধরে পানির এই স্তর আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিচু এলাকাগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে যেসব এলাকার মানুষ পূর্বের বন্যার ধকল সামলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন, তাদের আবারও নতুন করে পানিবন্দি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঘরবাড়ি ও চলাচলের রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে হতাশার গভীর ছাপ।
অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতিও যথেষ্ট উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদনদীগুলোর মধ্যে তিস্তা, ধরলা এবং দুধকুমার নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ ইতিমধ্যেই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির গজলডোবা ব্যারেজের সবকটি জলকপাট একসঙ্গে খুলে দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের ভেতরে তিস্তার পানিপ্রবাহ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সৃষ্ট এই চরম পরিস্থিতি কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়িয়েই সামাল দিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে এর ফলে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলগুলোতে আকস্মিক পানি ঢুকে পড়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তার পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলকে প্লাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে সোমেশ্বরী, ভুলাই এবং কংস নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার কিছু নিম্নাঞ্চলেও স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ বলছে, দেশের প্রধান নদীব্যবস্থার অন্যতম ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি আগামী পাঁচ দিন পর্যন্ত লাগাতার বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের নদীগুলোর ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গোমতী, মুহুরী, সেলোনিয়া, ফেনী ও হালদা নদীর পানি আগামী তিন দিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের উজানে টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুলেছে। ধরলা নদীর শিমুলবাড়ী পয়েন্টেও পানির সমতল আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি ভারতের উজানের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাত কমে আসে, তবে নদীর পানির এই বর্ধিত স্তর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
এদিকে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির এই অবনতির মাঝেই আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে দেশজুড়ে আরও একটি প্রতিকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান করা হয়েছে। আবহাওয়ার বার্তা অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ এলাকায় দমকা হাওয়া অথবা ঝোড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণেরও জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই বর্ষণ অব্যাহত থাকার ফলে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও রাতের তাপমাত্রা সামান্য পরিমাণে হ্রাস পেতে পারে। একাধারে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা এবং অন্যদিকে বারবার বৃষ্টিপাতের এই পূর্বাভাস জনজীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
প্রাকৃতিক এই বৈরিতা ও সম্ভাব্য বন্যার মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন ত্রাণ ও উদ্ধারকারী সংস্থার পক্ষ থেকে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। নদী তীরবর্তী এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য বা প্রয়োজনীয় সতর্কাবস্থায় থাকার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মানুষ তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, শুকনা খাবার এবং গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন। বারবার ঘনীভূত হওয়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ থেকে রক্ষা পেতে এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত