ছাত্রদল নিয়ে সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজীর বিতর্কিত মন্তব্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৩ বার
ছাত্রদল নিয়ে সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজীর বিতর্কিত মন্তব্য
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় রাজনীতিতে ফের এক তীব্র কথার লড়াই ও রাজনৈতিক উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি রংপুর মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে শাপলা চত্বরে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের এক বিশাল গণসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কঠোর ও সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে আয়োজিত ওই সমাবেশে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একটি পুরোনো উদ্ধৃতি টেনে এনে বর্তমান ছাত্রসংগঠনটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করেছে।
সমাবেশের বক্তব্যে সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী দাবি করেন যে, তিনি নিজে থেকে কোনো অবমাননাকর মন্তব্য করছেন না, বরং তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একটি পুরোনো উক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় বেগম খালেদা জিয়া আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে ছাত্রদলে কোনো প্রকৃত ছাত্র নেই, সেখানে সবাই বস্তির টোকাইদের মতো আচরণ করছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই প্রসঙ্গটি টেনে এনে তিনি ছাত্রদলের কার্যক্রমের কঠোর সমালোচনা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বর্তমান তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আচরণ ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় তিনি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইংরেজি ক্যালেন্ডারের তারিখের হিসাব বাদ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে ৫ আগস্ট দিনটি ‘৩৬শে জুলাই’ হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে আছে। সেই ৩৬শে জুলাইয়ের পটপরিবর্তনের পর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন যে ছোট ছোট মাসুম বাচ্চারা বা সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করেছে। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময় পার হতে না হতেই সেই একই তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় অংশ বেয়াদব বলে আখ্যায়িত করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরা এই ধরনের পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং বিভিন্ন ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন, দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসার ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হঠাৎ করে ছাত্রলীগের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি বা প্রভাব পুনরায় ভেসে উঠছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান জুলাই প্রদর্শনীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন যে, সেই সময় ছাত্রদলের কর্মীরা গিয়ে বিশিষ্ট ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ছবি সরানোর দাবি জানিয়েছিলেন, অথচ অতীতে এই ধরনের নেতাদের পাশেই রেখে বিএনপি চেয়ারপারসন নিজে দেশ পরিচালনা করেছিলেন।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া ও অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি কড়া সমালোচনা করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, অতীতে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল, সেগুলোকে যদি অন্যায় বা বিতর্কিত বলা হয়, তবে একই যুক্তিতে খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে আনীত মামলা বা সাজাকেও জুলুম হিসেবে গণ্য করতে হবে। ফ্যাসিবাদের আমলের সমস্ত বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া ও রায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক ও জুলুমে ভরপুর ছিল বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া সাম্প্রতিক একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রংপুরের সাধারণ জনগণ গত ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের লালকার্ড দেখিয়ে দিয়েছে এবং সেদিন ছাত্র-জনতার উত্তাল গণজোয়ার দেখে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পরদিন তথাকথিত লোক জড়ো করে তাদের হাতে রামদা ও অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মতিউর রহমান নিজামীর মতো ধর্মীয় নেতাদের ব্যানারে আঘাত হানার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, আলেম-ওলামাদের ব্যানার বা ছবির ওপর জুতা দিয়ে আঘাত করার মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। অতীতে শাহবাগের আন্দোলনের সময়ও এ ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল, যার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে হেলিকপ্টারে চড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ও জাতির কলিজার টুকরা আলেম সমাজকে নিয়ে যেকোনো ধরনের তামাশা বা অবমূল্যায়ন করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে বলে তিনি সতর্কবার্তা দেন। এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিহার করে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি জোর দাবি জানান।
উক্ত জনসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক এটিএম আজম খান এবং পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সঞ্চালনা করেন মহানগর সেক্রেটারি আনোয়ারুল হক কাজল। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল। এছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের জেলা ও মহানগর পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও সমাবেশে বক্তব্য রেখে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। বক্তারা জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে ধারণ করে দেশ পুনর্গঠন এবং শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি না করার জন্য দলমত নির্বিশেষে সকলের প্রতি আহ্বান জানান। বর্তমান রাজনৈতিক উত্তাপের এই সময়ে এই ধরনের তীব্র ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বেশি সংঘাতপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত