প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের মতো একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবের দিন উদযাপনের আনন্দ মুহূর্তেই চরম বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনায় রূপ নেওয়ার এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশেষ এই জাতীয় দিবসটি উদ্যাপনের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের সম্মানে আয়োজিত প্রীতি ভোজ বা ফিস্টের খাবারে নিম্নমানের সামগ্রী পরিবেশন এবং পচা খাবার বিতরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আর এই তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করেই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি, হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে। এই হট্টগোল ও মারামারির মাঝখানে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান। দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ন্যাক্কারজনক কাণ্ড শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত বুধবার অর্থাৎ ৫ আগস্ট সন্ধ্যার পর থেকে রাতের বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা দিবস হলের প্রাঙ্গণে এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে তিতুমীর হল, বিজয় দিবস হল, স্বাধীনতা দিবস হল, বনলতা হল এবং অপরাজিতা হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিশেষ ফিস্টের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু খাবার পরিবেশন শুরু হওয়ার পরপরই হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরিবেশিত খাবারের মান নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করেন। হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উৎসবমুখর পরিবেশে যে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করার কথা ছিল, তার পরিবর্তে অত্যন্ত নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। বিশেষ করে খাবারের সঙ্গে সরবরাহ করা ডিমগুলোর অধিকাংশ ছিল পচা এবং ডালের পাত্রে মুরগির নাড়িভুঁড়ি পাওয়ার মতো চরম অবহেলার চিত্র সামনে আসে।

এই মানহীন ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের খবর মুহূর্তের মধ্যে হলের বিভিন্ন ব্লকে ছড়িয়ে পড়লে পাঁচটি হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান এবং হলের ডাইনিং ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার তীব্র সমালোচনা করতে থাকেন। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একাংশের সঙ্গে খাবারের পক্ষে বা প্রশাসনকে রক্ষা করার চেষ্টার অভিযোগে অন্য পক্ষের শিক্ষার্থীদের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই মৌখিক বিতর্ক রূপ নেয় হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায়। হলের পরিবেশ নিমেষেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্দেশ্যে সেখানে উপস্থিত হন। তিনি দুই পক্ষের শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং খাবারের মান নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি ইতিবাচকভাবে সমাধানের অনুরোধ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতার এই মধ্যস্থতার চেষ্টা হলের কিছু উত্তেজিত শিক্ষার্থীর মাঝে আরও বেশি ক্ষোভের জন্ম দেয়। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উল্টো তার ওপর চড়াও হন এবং তাকে শারীরিকভবে লাঞ্ছিত করেন। এতে তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আহত হন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের জোরালো আশ্বাসের পর শিক্ষার্থীরা শান্ত হন। ভুক্তভোগী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে তিতুমীর হল, বিজয় দিবস হল, স্বাধীনতা দিবস হল, বনলতা হল ও অপরাজিতা হলসহ ক্যাম্পাসের প্রতিটি আবাসিক হলে শতভাগ মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিতুমীর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রাকিউল আলম রানা গণমাধ্যমকে জানান যে, জুলাইয়ের মতো একটি পবিত্র ও ঐতিহাসিক দিবসে শিক্ষার্থীদের জন্য এত নিচে মানের ও অখাদ্য খাবার পরিবেশন করা হবে তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডালের মধ্যে মুরগির নাড়িভুঁড়ি পাওয়া এবং পচা ডিমের গন্ধযুক্ত খাবার মুখে তোলার কোনো উপায় ছিল না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই ধরনের উপহাস কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা অবিলম্বে এই ঘটনার পেছনে থাকা দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে বলেও তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভ ও অসন্তোষের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বাধীনতা দিবস হলের প্রভোস্ট ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান জানান যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি হলের শিক্ষার্থীদের মাঝে খাবারের মান নিয়ে যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা নিয়ে হাতাহাতির পর্যায়ে গড়িয়েছে, সে বিষয়ে তারা অবগত হয়েছেন। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ তাদের দপ্তরে এসে পৌঁছায়নি। লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তিসাপেক্ষে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে সমগ্র বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে কারো প্রতি বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুস সাদাত গণমাধ্যমকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, আবাসিক হলের খাবারের মান নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং যে অনভিপ্রেত মারামারির ঘটনা ঘটেছে, তা সম্পূর্ণ তার নজরে এসেছে। পুরো বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার পেছনের মূল কারণ উদঘাটন করা হবে এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এই ধরনের অনিয়ম ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।