প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক ও রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আজ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক দিন। বিগত ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সেই গণ-আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের রাজপথে ওয়াসিম আকরামসহ ছয় তরুণকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা বহুল আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ মোট ২২ জন অভিযুক্ত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষা ও বিচারপ্রার্থী পরিবারের আকুল আর্তনাদের পর এই বিচারকার্য শুরু হওয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে আরও এক ধাপ অগ্রগতি সাধিত হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর স্বনামধন্য চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর অত্যন্ত দক্ষ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বিশিষ্ট বিচারিক প্যানেলের এজলাসে এই বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। আদালতের পূর্বনির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক সূচনা বক্তব্য বা ওপেনিং স্টেটমেন্ট উপস্থাপনের মধ্য দিয়েই আজকের এই বিচারিক কার্যক্রমের শুভসূচনা ঘটে। এর আগে গত ৩০ জুন ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে এই ২২ জন প্রভাবশালী আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা চার্জ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর যুগান্তকারী আদেশ প্রদান করা হয়েছিল। সেই আদেশেই আজকের এই দিনে মামলার প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছিল, যার ধারাবাহিকতায় আজ আদালতের বিচারিক প্যানেলের সামনে সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রদান ও প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।

আলোচিত এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটিতে মোট ২২ জন অভিযুক্ত আসামির নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে বন্দি রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। কারাবন্দি এই আসামিদের তালিকায় অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী। এ ছাড়াও এই তালিকায় আরও রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, মো. ফিরোজ এবং দেবাশীষ পাল দেবু। বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন তাদের অত্যন্ত কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে হাজির করা হয়, যেখানে তাদের উপস্থিতিতেই আদালতের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, এই মামলার অভিযুক্ত বাকি আসামিরা ঘটনার পর থেকেই আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। পলাতক এই আসামিদের তালিকায় দেশের রাজনীতি ও স্থানীয় প্রশাসনের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় হেভিওয়েট নেতার নাম রয়েছে। যাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন। এ ছাড়া পলাতক অন্যান্য আসামিদের তালিকায় রয়েছেন রেজাউল করিম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচএম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ এবং সুমন দে। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে এবং ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকার্য এগিয়ে চলেছে।
মামলার নথিপত্র ও আইনি প্রক্রিয়া পর্যালোচনায় জানা যায়, এর আগে গত ৭ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-২ আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত তিনটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে গ্রহণ করেছিলেন। তারও আগে, গত ৫ এপ্রিল প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে সুনির্দিষ্ট ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল। প্রসিকিউশনের দাখিল করা প্রথম অভিযোগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসামিদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও নির্দেশে সংঘটিত হামলায় ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং মো. ফারুকের মতো নিরীহ ও তরতাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। মামলার দ্বিতীয় অভিযোগে তানভীর সিদ্দিকী, সায়মন ওরফে মাহিম এবং হৃদয় চন্দ্রকে অত্যন্ত নির্মমভাবে শহীদ করার সুনির্দিষ্ট দায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া তৃতীয় অভিযোগে অত্যন্ত বর্বরোচিতভাবে হামলা চালিয়ে জাহিদ হাসান, আবদুল কাদের, আছিয়া খাতুন, সানজিদা সুলতানা এবং আবদুল্লাহসহ শতাধিক নিরীহ ছাত্র-জনতাকে গুরুতর আহত ও পঙ্গু করার চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ এবং দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই বিচারকার্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে দেশবাসীর প্রত্যাশা। বিগত দিনে ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা দেশের সাধারণ জনগণের ওপর বর্বরোচিত জুলুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা ও আহত ছাত্র-জনতা। আজকের এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর মধ্য দিয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত বিচার প্রক্রিয়ার একটি দৃশ্যমান ও শক্তিশালী রূপ লাভ করায় সচেতন মহলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখা গেছে। ট্রাইব্যুনালের এই ঐতিহাসিক বিচারকাজ নির্ভয়ে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে এবং অপরাধীরা উপযুক্ত শাস্তি পাবে—এমনটাই এখন পুরো জাতির প্রত্যাশা।