ডিজিটাল ভূমি সেবায় জবাবদিহি নিশ্চিতের নির্দেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ বার
ডিজিটাল ভূমি সেবায় জবাবদিহি নিশ্চিতের নির্দেশ
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ, আধুনিক এবং জনবান্ধব সেবায় রূপান্তর করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মনিরুজ্জামান মিঞা। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রদত্ত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে শতভাগ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীর সামান্য অবহেলা, অযথা গাফিলতি কিংবা দুর্নীতির বিন্দুমাত্র অভিযোগও কোনো অবস্থাতেই বরদাস্ত করা হবে না। দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি।
বিভাগীয় কমিশনার মনিরুজ্জামান মিঞা তাঁর সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন যে, ভূমি-সংক্রান্ত যেকোনো সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকার ধারাবাহিকভাবে ডিজিটাল সেবার পরিধি সম্প্রসারণ করে চলেছে। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ নাগরিকদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ভোগান্তি ও হয়রানি বহুলাংশে হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতীতে সাধারণ মানুষকে একটি নামজারি সম্পন্ন করতে, খতিয়ান সংগ্রহ করতে কিংবা সামান্য ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করার মতো সাধারণ কাজের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে কষ্টকর অপেক্ষা করতে হতো। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতারা নানা ধরনের দালাল চক্রের অপতৎপরতা ও দুর্নীতির খপ্পরে পড়ে চরম আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হতেন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনলাইনে খুব সহজেই আবেদন দাখিল, আবেদন যাচাই-বাছাই, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ এবং আবেদনের বর্তমান অবস্থা ট্র্যাকিং করার মতো বিভিন্ন কার্যকরী সেবা চালু হওয়ায় জনগণ এখন নিজ ঘরে বসেই বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হচ্ছেন।
সরকারের মূল লক্ষ্য কেবল নামমাত্র ডিজিটাল সেবা চালু করা নয়, বরং প্রতিটি সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত করা বলে তিনি স্পষ্ট জানান। এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিয়মিতভাবে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে এবং তাদের প্রদত্ত সেবার মান অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রযুক্তির ছোঁয়া যতই লাগুক না কেন, তা পরিচালনার জন্য দক্ষ, আন্তরিক ও দায়িত্বশীল জনবলের বিকল্প নেই। তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতি ইতিবাচক ও সেবামুখী মনোভাব গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। জনগণের মৌলিক অধিকার ও সেবা প্রদানে সামান্যতম অবহেলা, ইচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রতা বা যেকোনো ধরনের অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারের বহুমুখী সুবিধার কথা তুলে ধরে বিভাগীয় কমিশনার কৃষক কার্ড এবং ফ্যামিলি কার্ড চালুর প্রসঙ্গ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান যে, কৃষকরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং তাদের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করে সরকারি সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের খুব সহজেই সঠিকভাবে শনাক্ত করে সরকারি কৃষি প্রণোদনা, সময়মতো ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান করা আরও সহজ হবে, যা কৃষি খাতের উন্নয়নে বিপ্লব ঘটাবে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে সরকারি সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে, যার ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য বা দুর্নীতি থাকার সুযোগ থাকবে না। ভূমি তথ্য, কৃষক তথ্য এবং পারিবারিক তথ্যের মধ্যে একটি সুদৃঢ় সমন্বয় তৈরি করা গেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আরও বেশি গতিশীল ও স্বচ্ছ হবে।
ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নির্ভরতা চিরতরে নির্মূল করতে নানামুখী কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। অনলাইন সেবা চালুর ফলে দালালদের অবৈধ উপার্জনের পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। প্রতিটি ভূমি অফিসে অভিযোগ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যেকোনো নাগরিকের আবেদন নিষ্পত্তি করার জন্য কঠোর নির্দেশনা ও নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আধুনিক এই ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার বদৌলত ভবিষ্যতে জাল দলিল তৈরি, ভুয়া রেকর্ড প্রস্তুত কিংবা একই জমি নিয়ে একাধিক ব্যক্তির ভুয়া দাবির মতো জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী অনিয়মগুলো খুব সহজেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারের সুবাদে যেকোনো জমির সঠিক তথ্য মুহূর্তের মধ্যে যাচাই করা যাবে, যা পরবর্তীতে ভূমি-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ বিরোধগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখাবে।
সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ বার্তা দিয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, কোনো ধরনের দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর শরণাপন্ন না হয়ে সরাসরি সরকারি নির্ধারিত পদ্ধতিতে কিংবা অনলাইনের মাধ্যমে সমস্ত ভূমিসেবা গ্রহণ করুন। কোথাও কোনো ধরনের হয়রানি বা অনিয়মের শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনকে অবহিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আশ্বাস দেন যে, অভিযোগ প্রাপ্তমাত্রই দ্রুততার সঙ্গে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জনগণের অর্জিত আস্থার পূর্ণ মর্যাদা রক্ষা করাই প্রশাসনের সব সদস্যের সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়িত্ব। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও বেশি জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে যারা চমৎকার কাজ করবেন, তাদের যথাযথভাবে পুরস্কৃত করা হবে, আর যারা অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে নিজেদের জড়াবেন, তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোরতম শাস্তিমূলক পদক্ষেপ।
ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করে তিনি জানান যে, ভূমি রেকর্ড, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, ডিজিটাল মানচিত্র এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সেগুলোকে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার কাজ বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এই সমন্বিত ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে দেশের নাগরিকরা একক কোনো মাধ্যম বা জায়গা থেকেই অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমি-সংক্রান্ত সেবা খুব সহজেই গ্রহণ করতে পারবেন। আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই যাত্রায় যুগোপযোগী ভূমি প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই। ভূমি ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বেশি বেগবান হবে। জনগণের মৌলিক প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে বর্তমান প্রশাসন পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত