প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রবিরোধী নানা অপতৎপরতা ও গোপন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ৪৪ জন শিক্ষককে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হকের স্বাক্ষর সংবলিত একটি জরুরি অফিস আদেশের মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তদন্ত কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়। দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম এই বিদ্যাপীঠে শিক্ষকদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর রাষ্ট্রদ্রোহী ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠার পর থেকে গোটা একাডেমিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটিকে আগামী ১২ আগস্টের একটি নির্দিষ্ট ডেডলাইনের মধ্যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সমস্ত অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
সম্প্রতি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের গোপন তৎপরতা’ শীর্ষক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চাঞ্চল্যকর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছিল যে, ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামক একটি গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুনরায় দেশে ফিরিয়ে আনার এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে গোপনে সক্রিয় করার উদ্দেশ্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সুদূরপ্রসারী গোপন তৎপরতা চালিয়ে আসছিল। প্রকাশিত সেই গোপন প্রতিবেদনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৪৪ জন শিক্ষকের নাম ওই টেলিগ্রাম গ্রুপের সক্রিয় সদস্য হিসেবে জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়। সংবাদমাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর দেশজুড়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে নড়েচড়ে বসে এবং এই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

প্রকাশিত অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং এর গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের জন্য গঠিত পাঁচ সদস্যের এই বিশেষ তদন্ত কমিটিতে অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ ও সম্মানিত শিক্ষকদের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেনকে এই গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কমিটির অন্যান্য সম্মানিত সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রথিতযশা অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানেল আইনজীবী ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ড. সাজ্জাত হোসেন। অন্যদিকে, কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব বিভাগের সুযোগ্য উপ-হিসাব পরিচালক ইসরাফুল হক। অভিজ্ঞ এই ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গঠিত কমিটি অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক ইস্যু করা অফিস আদেশে সুনির্দিষ্ট কিছু কার্যপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গঠিত এই তদন্ত কমিটি আনীত অভিযোগগুলোর সত্যতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যাচাই করবে এবং এর সঙ্গে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন, তবে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করবে। পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই বিষয়ে করণীয় কী হতে পারে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করবে এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা দেবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অভিযুক্ত এই শিক্ষকরা বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের উসকানি দিয়েছিলেন কি না কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানামুখী হুমকি বা হয়রানি করার মতো অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন কি না, তাও এই তদন্তের আওতায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

তদন্ত প্রতিবেদনের প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সার্ভিস রুলস বা সংবিধি এবং দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ও কঠোরতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ইতোমধ্যে নবগঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন গণমাধ্যমের কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে জানান যে, তাঁরা ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক চিঠি হাতে পেয়েছেন এবং আগামী শনিবার থেকেই তাদের মূল তদন্ত কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করবেন। নির্ধারিত সময়ের সীমার মধ্যেই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সন্তোষজনক ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেওয়া হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের রাজনৈতিক অপশক্তির প্রভাবমুক্ত করতে এবং শিক্ষক সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ করতে এই ধরনের কঠোর প্রশাসনিক তদন্ত ও বিচার অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং অপরিহার্য একটি পদক্ষেপ।