সর্বশেষ :

রাজধানীতে চাঁদাবাজির জাল, বাড়ছে সহিংসতার আতঙ্ক

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৮ বার

প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকায় চাঁদাবাজির বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একসময় চাঁদাবাজি নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়িক খাত বা প্রভাবশালী অপরাধী চক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে পরিবহন, বাজার, নির্মাণকাজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন নগরসেবার খাতে। চাঁদার দাবিকে কেন্দ্র করে হুমকি, হামলা এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নিয়মিত চাঁদা না দিলে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি শুধু একটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়; এটি একটি অবৈধ অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে। যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় আধিপত্য এবং দুর্বল জবাবদিহি একে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, ভাষানটেক, কেরানীগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিদিনের আয়ের একটি অংশ বিভিন্ন নামে দিতে হচ্ছে। কোথাও দোকান বসানোর জন্য, কোথাও বিদ্যুৎ বা পরিষেবা ব্যবহারের নামে, আবার কোথাও নিরাপত্তার অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

যাত্রাবাড়ীর এক মাছ ব্যবসায়ীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ব্যবসা করার পরও নতুন করে দোকানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। নির্ধারিত অর্থ দিতে না পারায় তাকে ব্যবসার জায়গা ছাড়তে হয়েছে। পরে অন্য এলাকায় ব্যবসা করার চেষ্টা করলেও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শুধু একটি বাজার নয়, রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার, মাছের আড়ত, ফলের দোকান ও ফুটপাতকেন্দ্রিক ব্যবসায় একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরিবহন খাতেও চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন রুটের বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এসব অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত যাত্রী ও ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করে।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকাতেও ফুটপাত ও দোকান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, বিভিন্ন অজুহাতে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্য সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।

চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত এক বছরে রাজধানীতে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসে রাজধানীতে চাঁদাবাজির ঘটনায় শতাধিক মামলা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়েছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মামলা ও গ্রেপ্তার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। চাঁদাবাজির পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর অনেক এলাকায় ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন পরিষেবা খাতকে ঘিরে একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এই অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সহিংসতার আশ্রয় নেয়।

অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, যখন কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আয় হয় এবং সেই অর্থের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগাযোগ তৈরি হয়, তখন অপরাধ দমন কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে শুধু মাঠপর্যায়ে অভিযান নয়, অর্থের উৎস ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটপাত দখল, অবৈধ বাজার, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতে স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা না থাকায় অপরাধী চক্রের জন্য সুযোগ তৈরি হয়। এসব খাতে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা গেলে অবৈধ নিয়ন্ত্রণ কমানো সম্ভব।

রাজধানীবাসীর অভিযোগ, সাধারণ মানুষ এখন শুধু বড় ব্যবসায়ী নয়, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ক্ষেত্রেও চাঁদাবাজির চাপ অনুভব করছেন। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে প্রতিদিনের সামান্য আয় থেকে অতিরিক্ত অর্থ হারানো যেমন বড় ক্ষতি, তেমনি একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিও বাড়ছে।

চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত এবং নগর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে রাজধানীতে চাঁদাবাজির সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার মতো জনবহুল একটি শহরে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত