প্রকাশ: ০৯ আগস্ট, ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নাটোরের গুরুদাসপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সময় বাড়ির গেটে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, কাচের জানালা ভাঙচুর, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা নষ্ট করার অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট পরিবার। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, রোববার দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে গুরুদাসপুর পৌরসভার কাচারীপাড়া মহল্লায় অবস্থিত অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসের বাড়ির সামনে হঠাৎ করেই একদল ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে জড়ো হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি মোটরসাইকেলে করে আসা ওই ব্যক্তিরা বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। একপর্যায়ে বাড়ির ভেতরেও ইট ছোড়া হয়। এতে প্রধান গেটের কাচ, কয়েকটি জানালা, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বাইরের বৈদ্যুতিক লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার সময় বাড়ির ভেতরে অবস্থানরত সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। তাঁদের দাবি, হামলার আকস্মিকতায় পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। যদিও এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবু বাড়ির বিভিন্ন স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, পুরো ঘটনার কিছু অংশ বাড়িতে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে। ফুটেজে দেখা যায় বলে তারা জানিয়েছে, মোটরসাইকেলবহর নিয়ে একদল ব্যক্তি বাড়ির সামনে এসে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছে। তবে ভিডিও ফুটেজের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা অন্য যেকোনো বিরোধ থাকলেও সহিংসতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে একই এলাকায় আরও একটি ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগের রাতে গুরুদাসপুর পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম সবুজ ফকিরের বাড়িতে লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। তিনি বর্তমানে নাশকতার একটি মামলায় কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিবারের দাবি, দুর্বৃত্তরা বাড়ি থেকে প্রায় সাত ভরি স্বর্ণালঙ্কার এবং প্রায় দেড় লাখ টাকা নগদ অর্থ নিয়ে গেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, স্বর্ণালঙ্কারের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৪ লাখ টাকা।
তবে এই লুটপাটের অভিযোগের বিষয়েও এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ওপর নির্ভর করবে।
গুরুদাসপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রিয়াজ হাসান বলেন, একটি মিছিল যাওয়ার সময় হামলার চেষ্টার মতো একটি ঘটনার কথা তিনি শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, লিখিত অভিযোগ দায়ের হলে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় ব্যক্তিগত বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর কিংবা লুটপাটের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো অভিযোগ বা বিরোধের সমাধান আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা এবং সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হামলা বা ভাঙচুর আইনের শাসনের পরিপন্থী।
এদিকে ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। নতুন করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, হামলার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল এবং এটি পূর্বপরিকল্পিত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশ জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে।
নাটোরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ফলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত এবং পরবর্তী অগ্রগতির দিকেই নজর রাখছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট মহল।